Monday, December 2, 2024

২। খারলং

 ২। খারলং


ধোঁয়া —- সিগারেটের, চা'য়ের, চা যেখানে তৈয়ার হচ্ছে, সেই চুলার —- সব মিশে যাচ্ছে, অথবা পরিণত হচ্ছে, কুয়াশায়। এখানে, এখনো মাঝে মাঝেই, একেকটা দিন এরকমই যায়। সকাল ঘন কুয়াশা মুড়ি দিয়ে এসে, আস্তেধীরে, দুপুর কিংবা দুপুরও পার করে, কোনোদিন উদাম হয়। ঢুকতে দেয় সূর্য্যালোক। কোনদিন দেয়ই না। চাদর গায়েই বিকাল মিশে যায় রাত্রিতে। “আউর এক কাপ দিজিয়ে” বলা খদ্দেরের হাতে দ্বিতীয় কাপ চা দিতে দিতে থাওসেনবুড়া, তার নিজ ভাষাকে হিন্দির নিকটতম করে যা বলে, তার অর্থ হয়, যে, তার অভিজ্ঞতা বলছে, আজকের কুয়াশা দুপুর নাগাদ কেটে যাওয়া উচিত। বলে, তুমি তো বেড়াতে এসেছ। নতুন মানুষ। তুমি জানোনা। এরকম কুয়াশা-দিন, বেশি আগের কথা না, আমার বিয়ের পরেও, মাসে, যে কোনো মাসে, যে কোনো ঋতুতেই প্রায়, দশটা-পনেরোটা, ইয়ে, কম করেও সাত-আট-টা আসতো। এখন যত্তো গাছ-গাছালি কমছে, যত্তো বাড়ি-গাড়ি বাড়ছে, কুয়াশার দেবী ততো রেগে উঠছেন। সড়ে যাচ্ছেন দূরে। আমাদের শহর তো তবু এখনো দেবীর অনেক কাছে, এখনো,  শুধু ঘোর শীতে হলেও, দুই-চারদিন বরফের মুখ দেখা যায়। কিনারের পাড়ারগুলো দেখো। শিলং বলো, হাফলং বলো, কুয়াশাও আমাদের চেয়ে কম। আর বরফ? —- ভুলেই যাও।

তোড়ে হয়তো আরো অনেক কথা বলে যেতো বুড়া থাওসেন, কিন্তু অন্দর থেকে, তাদের ভাষায়, নাতনী তাড়া লাগায় কোনো কাজের জন্য। “আসছি রে বোন আসছি” বলতে বলতে যায় বুড়া। মিনিট দশ। আবার আসে। আরো দুইজন খদ্দের এসেছে চায়ের। মাথা নেড়ে চলে যায় দোকানঘরের অন্দরে। ফিরে আসে দুই কাপ চা নিয়ে। চায়ের কাপ হাতে হাতে দিয়ে, যেন মাঝখানে কিছুই বাদ যায়নি, যেন এরাও হাজির ছিল তার বকবকানির প্রথম সর্গে, সেরকম করেই, যদিও এই দুই খদ্দের তার নিজের ভাষারই, তবু, তার নিজ ভাষাকে হিন্দির নিকটতম করে বলে যায়ঃ ওই যে বলছিলাম কুয়াশার দেবী রাগ করে দূরে সড়ে যাচ্ছেন, দেখছোনা, তার ফলও যে ফলছে হাতেহাতে। কথানাই বার্তানাই বাঙ্গালী অফিসারবাবুর লাশ সেদিন সকালে ভেসে উঠলো লেকের জলে। তুমি তো বেড়াতে এসেছো। তুমি হয়তো জানো না। এরা জানে। হ্যাঁ, মানি, বাবুটা নেশাভাং করতো। হয়তো নেশার ঘোরেই পরে গেছে জলে, সাঁতরাতে পারেনি, কিন্তু এখন কেন? এত বচ্ছর পরে কেন? এই বাঙ্গালী বাবু তো এখানে আছে প্রায় এক কুড়ি কাল। এক কুড়ি কাল আছে, কিন্তু কুয়াশার দেবী তো তখন মানুষজনের উপর খেপে ছিল না। তাই কিছু হয়নি। কারোরই হয়নি। এখন কুয়াশার দেবী রেগে যাচ্ছে। দেখবে, এখন আরো কত কি ঘটে। দেখেনিও, কুয়াশার দেবী প্রতিশোধ নেবে। নেবেই। এতো এতো গাছ, পাহাড়, টিলা গায়েব করবার বদলা নেবেনা? এই সব গাছ, পাহাড়, টিলা, পাখি, জন্তু —- এদের মালিক কে? তুমি? আমি? সরকার?  না। কেউ না। এই সব কিছুর মালিক দেবী।

আবার আওয়াজ আসে অন্দর থেকে। বুড়ার নাতনি ডাকে। বুড়া যায় দোকানের অন্দরে। অন্দর আর দোকান-অন্দর অবশ্য এক নয়। দোকান, বুড়া থাওসেনের, আরো অনেকেরই, কাঠের পাটাতনের উপর, কাঠের শরীর আর টিনের চাল নিয়ে, কাঠের খুঁটিতে ভর দিয়ে, টিলার গায়ে দাঁড়ানো। থাওসেন বুড়ার দোকানে পাটাতন কাঠের, খুঁটি কাঠের, চাল টিনের, তবে দোকান-শরীর বাঁশের বেড়া। এমন আরোও আছে। –--এটি দোকানের বাইর। দোকানের অন্দর সাধারণত হয় সেই দিকটি, যে দিক ঠেকে আছে টিলাতে। সেদিকে থাকে দরজা। কাঠের মই, সিঁড়ির মতো করে নেমে গিয়ে মিশেছে টিলায়। সেখানে কোমর অব্দি সিমেন্ট আর বাকিটা বাঁশের অথবা বাঁশের উপর সিমেন্ট বা মাটির পলেস্তারা।  চাল টিনের। —- আদত অন্দর। অন্দরমহল।

শহরটি ছোটো।  তবে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে টুরিস্ট-স্পট প্রতিযোগিতায়। ফলে ভিড় থাকে সারা বছরই। আর ভিড় থাকার সুবিধা এই, যে, ভিড়ে মিশে অদৃশ্য হয়ে যাওয়া যায়। তাছাড়া এই যে ভিড়, বেড়াতে আসা লোকের, তাতে অদৃশ্য হয়ে থাকা, মিশে থাকা, ভিড়ের দেহে, নিবিড়তর ভাবে, হয় সম্ভব। ঠিক যেমন থাওসেন বুড়ার দোকানের ওই “ আউর এক কাপ দিজিয়ে” বলা খদ্দেরটি, থাওসেন বুড়ার বক্তৃতার দ্বিতীয় সর্গের শেষাশেষি উঠে মিশে গেলো কুয়াশায়, মিলিয়ে গেলো ভিড়ে। “তা, যা বলছিলাম, তোমরা তো জানোনা…” —- দ্বারা তার বক্তৃতার তৃতীয় সর্গ আরম্ভ করে টের পেলো ওই অনুপস্থিতি। টের পেলো এবং বিরক্তও হলো এই ভাবে মাঝ বক্তৃতায় উঠে চলে যাওয়ার জন্য। এ আসছে থাওসেন-বুড়ার দোকানে, আজ মিলিয়ে, থাওসেন দেখলো, তিন দিন। প্রথমদিনই, এ'কে বাঙ্গালী বলে জানামাত্র, ভেবেছিল বলবে। কিন্তু আজকাল অনেক জরুরি কথাই ভুলে যায় থাওসেন। ভুলে যাচ্ছে। ঠিক যেমন এই মুহুর্তে।  বাঙ্গালী ওই খদ্দেরকে কিছু বলবার আছে, এটা মনে পড়লেও, কি'যে বলবার, সেটাই এখন উড়ে গেছে মুন্ডু থেকে। দেখাযাক, কাল সকালে যদি আবার দোকানে আসে আর যদি তারও তখন মনেপড়ে ঠিকঠাক —- বিড়বিড় করতে করতে এইবার নিজেই বেঞ্চিতে বসে পড়ে বুড়া। একটা সিগারেট জ্বালায়।

কাটিং রোড নামক রাস্তার লাগোয়া সিঁড়ি বেয়ে রিপার স্ট্রিট নামক রাস্তার দিকে নামতে নামতে, থাওসেন-বুড়ার “আউর এক কাপ দিজিয়ে” বলা খদ্দের-জনও পকেট থেকে বার করে আনে সিগারেট-প্যাকেট। এই শহরে এটা তার দ্বিতীয় বার আসা। প্রথমবারের আসা এবং যাওয়া সবই যেন ঘটেছিলো জ্বরের মধ্যে। ঘোরের মধ্যে। এইবারও একটা জ্বরভাব, বাস্তবিক সে টের পাচ্ছে সবসময়।  কিন্তু ঘোরটা নেই। ফলতঃ এইবার সে রাস্তা-নাম গুলি লক্ষ্য করে এবং বলে, নিজেকেই, সাম্রাজ্যবাদ যদি জানতো যে তাকে ভোল পাল্টাতে হবে, তবে কি রাখতো এই রাস্তা-নাম গুলি? নাকি জানতো বলেই এই সকল নামের ছ্যাঁকা সে দিয়ে গেছে, তার দ্বারা দখলীকৃত প্রত্যেকটি দেশের গায়ে?


Sunday, December 1, 2024

১। ইঞ্জিন

 ১। ইঞ্জিন


“ কি ইঞ্জিন সাহেব, মেজাজ ঠিক নেই মনে হচ্ছে?”  

বয়স চল্লিশ পেরোনো, মাথায় চুল কমে এলেও যে টুকু আছে, সে টুকুকেই বাঁ দিকে ফিটফাট সিঁথি করে আঁচড়ানো, কুচকুচে কালো, লম্বা, সিড়িঙ্গে মার্কা যে মানুষ টি বাক্যটির বক্তা, সে, কুন্ডু। কুন্ডুদা। সে পেশায় “ফিটার”। এই শালা-জামাইবাবু কোম্পানির পুরনো মানুষ। তবে সুকুমারের “ইঞ্জিন” নামটি তার দেওয়া নয়। এটি দিয়েছে স্বপন। স্বপন, হয় “ক্রেইন অপারেটর”। বয়সের যে মাপ বছরের সংখ্যা দ্বারা হয় নির্নীত, তাতে স্বপন, সুকুমারের চেয়ে কয়েক বছরের বড় হলেও, পৃথিবী নিজে যেখানে পাঠশালা, তার ছাত্রত্বের, তাতে অর্জনের নিরিখে, সুকুমার টের পায়, তাদের ব্যবধান কয়েক জন্মের। স্বপন, সুকুমারের চেয়ে অন্তত কয়েক জন্মের বড়।

স্বপনই তার নাম দিয়েছে ইঞ্জিন।  এখানে আসবার প্রথম কিংবা বড়জোর দ্বিতীয় দিনে। 

“আপনাকে দেখে তো মোটেই লাইনের বলে মনে হচ্ছেনা”। বেশ নাটুকে সুরে আর ভঙ্গিতে বলেছিল স্বপন। এই অফিসকোঠাতেই। অফিস বলতে টাটাবাবার দুর্গ অভ্যন্তরে যে অস্থায়ী তিন কোঠার কাঠামো, যার আয়ু প্রোজেক্ট শেষ হলেই খতম, যে রকম অফিস খুলে বসে আছে আর সকল ছোটোবড়ো ‘কোম্পানি’রা, সেই রকমই একটি। 

দুই মালিকের একজন, অমিতাভ রায়, অফিসকোঠা ছেড়ে বাইরে যাওয়ামাত্র অন্য অন্য বাবুরাও পিছনে পিছনে বার হয়ে গেলে, অফিস মুহুর্তে হাল্কা। তখুনি কথাটা বলেছিল স্বপন। শুনে অবশ্যই হকচকিয়ে যাচ্ছিল সুকুমার।  দেখে তো মনেহয় লেবার ক্লাস। কিন্তু এমন ফড়ফড়িয়ে কথা, ফড়ফড়ানো কথা। হো হো হেসে বল্লো স্বপনঃ “ রেগে যাননি তো স্যার? অধমের নাম স্বপন। এখানে ক্রেন অপারেট করি। স্যার কি সাইট সুপারভাইজার হয়ে এলেন নাকি? সাহাবাবুর পাততা কাটলো নাকি তবে?”

“সাইট সুপারভাইজার”? মানে “ওভার সী-আর”? এসব তো, সুকুমার জানে, ডিপ্লোমা দের জন্য। যে ডিভিশনেই হোক আর যে ভাবেই হোক সুকুমার বি.ই পাশ দিয়েছে আর তাছাড়া এপয়েন্টমেন্ট লেটারেও লেখা আছে, সে ইঞ্জিনিয়ার। সুতরাং স্বপনের প্রশ্নের দিকে সে ছুঁড়ে দেয় ওই শব্দটিই। আবার হাসে স্বপন। “হুঁ, আমিও তা'ই বলেছিলাম কুন্ডুদা'কে, আপনাকে দেখামাত্র। ইঞ্জিনিয়ার।  স্যারের কোন ডিগ্রি নেওয়া হলো?”

“বি.ই”। পলক থেকে “ আর.ই.সি, শিলচর”।

“আপনার প্রথম চাকরি?”

যদিও বাবার সৎভাইএর দৌলতে জুটেছে, তবু চাকরি তো বটে। প্রথম চাকরি।  ঠিক।

“এদের আসলে ইঞ্জিনিয়ার দরকার নেই। এদের লাগে ইঞ্জিন”। আমার হোহো হাসিতে ফেটে পড়ে বেঁটেখাটো, সামান্য নধর-মতো হলেও পিটানো শরীর আর মোটা গোঁফের অধিকারী এই লোকটি। এইবার এগোয় কুন্ডুদা। “ স্বপনের ইয়ার্কিতে আপনার মুখ যা হয়েছিল, তা দেখেই প্রানে মোচড় দিলো”। পরে বলেছিল কুন্ডুদা।

“ এই স্বপন,  তোর ইয়ার্কি থামাতো। স্যার, ব্যাপার হচ্ছে, মানে জেনে রাখাটা আপনার জন্যই, ভালো, ইয়ে, মানে, এরা, এখানে, মানে এই শালা-জামাইবাবু কোম্পানি,  মানে, এই ক্যামকন কোম্পানি,  এদের আসলে পাশ-করা ইঞ্জিনিয়ারের কোনো দরকারই নেই। দরকার আপনার সাটিফিকেট টা আর সই। স্বপন, মানে ওই কথাটাই…”

সুকুমার ইঞ্জিনিয়ার সেই থেকে এই তিনজনের নিভৃত আসরে “ইঞ্জিন”। এই তিনজনের নিভৃতি যতো সহজে হয়েছিল,তেমন আর হয়নি। এতাবৎ। সুকুমারের। 

যদিও পণ্য কেন্দ্রীক ব্যবস্থায় চাষী, কৃষক ও আদতে মজুর, ক্ষেতমজুর, তথাপি যে অঞ্চলে সুকুমার-বুদ্ধ দের বেড়েওঠা, রাজনীতি তে হাতেখড়ি —- সেখানে ক্ষেতমজুর এখনো, সর্বাংশে সব-ছাড়া, সব-হারা নয়। অতএব প্রথম চাকরির মতো মজুর শ্রেণীর সঙ্গেও এই প্রথম সাক্ষাৎ সুকুমারের। কিন্তু স্বপন বা কুন্ডুদাও যে নয় সেই অর্থে সব-ছাড়া, সব-হারা আর তাদের অন্দরের ওই না-লেবার সত্তা, যা মূলত মধ্যবিত্ত, তারই জমিতেই যে এই ত্রয়ীর একাত্মতার বীজ, কথাটি তৎক্ষনাৎ কেন, স্পষ্ট হতে লেগেছে অনেকটা সময়। তবে স্পষ্ট হয়েছে অন্তিমে।

“ কি ইঞ্জিন সাহেব, মেজাজ ঠিক নেই মনে হচ্ছে?”  —- বলে কুন্ডুদা। বলে “আজই দিনটা এমন বিশ্রী,  এমন মেঘলা করে ফেল্লো”। 

“তাতেই বোধহয় মুড খারাপ হয়ে গেছে আমাদের ইঞ্জিনের”।

“আরে নাহ। আমাদের ইঞ্জিন কবি মানুষ। মেঘলা দিনে কবিদের মেজাজ বিগড়ায় না। ইঞ্জিনের মন সত্যি সত্যি আজ ভাল না”।

ইশ, ভাগ্যে এরা ‘ইঞ্জিন’ বলে। ভাবে সুকুমার। যদি ‘স্যার, সাহেব’ করতো, তাহলে কি পারতো, তার বয়স, কাজে তার অনভিজ্ঞতা, তার একলা-একা থাকা-চেষ্টা —- সমস্ত মিলিয়ে তার, সুকুমারের প্রতি তাদের স্নেহ, ভালবাসা ঢেলে দিতে ডাকটিতে? স্বপন গোঁয়ারগোবিন্দ রকমের লোক। কাজ করে জান দিয়ে। মাল টানে পেট ভরে। হাসে হোহো করে। খুব সূক্ষ কিছু তার খুব একটা চোখে পড়েনা। কিন্তু কুন্ডুদা অন্য জিনিস।

প্রথম প্রথম,  যদ্দিন সিং মহলের কোঠা গুলি যায়নি ভর্তি হয়ে, মানে সব বাবু'রা এসে হাজির হওয়ার আগে অব্দি, সিং মহলেরই এক কোঠায় ছিল কুন্ডুদা। পরে, বাবুরা এলে, দূরের থেকে আনা শস্তা লেবার-দল হাজির হলে, কুন্ডুদা কেও লেবার-বস্তিতে যাওয়ার হুকুম দিলো কোম্পানি। কোম্পানি বলতে এখানে পরমেশ সেনই বুঝতে হবে। “এতো খরচ দিয়ে নেওয়া অফিসার্স কোয়ার্টারে লেবার থাকতে দিলে চলে? আজ কুন্ডু একটা রুম নিয়ে বসে আছে, কাল স্বপন বলবে আমাকেও রুম দাও। এরপরে পুরো লেবার বস্তি উঠে আসবে অফিসার্স কোয়ার্টারে থাকতে। প্লাস, হোয়াট এবাউট আদার্স? আই মীন অন্য কোম্পানির লোকেরাই বা কি বলবে? প্রেস্টিজ মেটার হয়ে যাবে বস”। রেখেঢেকে নয়, সর্বসমক্ষেই, সাহাবাবুকে বলেছিল পরমেশ সেন। যেন ওই মুহুর্তে আশেপাশে আর কেউ, কুন্ডুদা, স্বপন, সুকুমার —- কেউ —- নেই।

সিং মহলে কোঠা খালি থাকার আমলেও স্বপন কিন্তু নিজের ব্যবস্থা করে নিয়েছিল পিছনের বস্তিতে। পরে, ত্রয়ীর মদের আসরে, বলেছিলঃ “বুঝলে ইঞ্জিন, না না, তোমার কথা আলাদা। তুমি অন্য রকম, তুমি আলাদা, তুমি আমার ছোটভাই”...।

স্বপনের শিবের গীত থামিয়ে দিয়েছিল কুন্ডুদাঃ “ সেসব ইঞ্জিন জানে। লাটক না করে আসল কথা কিছু থাকলে বল, নাহলে চুপ যা”।

“হ্যাঁ, আসল। আসল কথা এটাই।”

“কোনটা?  ইঞ্জিন অন্য রকম? ইঞ্জিন আমাদের ছোটভাইয়ের মতন?”

“এটাও আসল কথা। ওইটাও আসল কথা”।

“ ওইটা আবার কোনটা?”

“আরে ওই যে বললাম, বারা, বাবুদের কাছ ঘেঁষতে আমার বমি পায়। আমি শালা ছোটলোক,  আমার কিনারে, আমার সঙ্গেও আমি ছোটোলোকই দেখতে ভালবাসি। আমাকে তো বারা পয়সা দিলেও ওই বাবুবাড়িতে থাকতাম না। আবার বলে কিনা অফিচার-কুয়াটার। শালা এই কুন্ডুদার হয়েছে মুশকিল”।

“ মুশকিল?  আমার? কিসের মুশকিল রে বারা?”

“আরে বারা, তুমি ওই মাঝখানের টা”। নিজের পুরুষাঙ্গের দিকে ইশারায় দেখায় স্বপন। “তুমি বারা না-ছোটলোক, না-ভদ্রলোক। তুমি শালা ওই বারার মতো। দুলছো। খালি দুলছো। ভদ্রলোকের ঠেলা খেয়ে এসে জোটো ছোটোলোক দের দলে। আবার পারোনা ছোটলোকের ছোটলোকামি সইতে। আমি বারা, স্বপন, বারা, জানো ইঞ্জিন, সেই হরিয়ানা থেকে এসেছি ট্রাকে চেপে। সেই দশ-চাক্কি, বারো-চাক্কি লরী। চারটা করে ক্রেইন, আরে, এই শালা জামাইবাবু কোম্পানির বিচি-ধোন ক্রেন নয় হে, ট্রিপল সাইজ। একেকটা ট্রাকে। রাস্তার খাওয়া, ঘুম, হাগামোতা, চোদা —- সব। আরেকবার সেই গুজরাটের দিকে…।”

“ স্বপনের মধ্যে লেবার-চরিত্র মধ্যবিত্ত চরিত্রকে ছাপিয়ে যায় হয়তো এই বেদুইন যাপনের নিমিত্তই। একফালি বাড়ি একটা আছে কোথাও। পৈতৃক।  শিকল ছাড়া ওই একটিমাত্র বস্তু তার, হারাবার। —- এখানেই সে পুরো মজুরগোত্র নয়।” --- বুদ্ধকে চিঠিতে লিখেছিল সুকুমার। লিখেছিল কুন্ডুদা-পর্বও। “ শেষ পর্যন্ত সাহাবাবু, চালু মাল, বল্লো সুকুমারবাবুর আপত্তি না থাকলে ওর কোনো অসুবিধা নেই। ভেবেছিল আমি রাজি হবোনা। কুন্ডুদা আগেই বলেছিল আমাকে। আমার এই ছাত-কোঠার ফ্লোরে ঘুমাবে বিছানা পেতে। আমার আর অসুবিধা কি? একমাত্র অসুবিধা হাত-মারা। তোকে তো বলেছি, যে, রাতে ছাতে দাঁড়িয়ে,  বসে —- আমি অনেকবার হাত মেরেছি। কুন্ডুদা আমার রুমে থাকলে সেটাই করব। তাই আমি সাহাকে বললাম, আমার আপত্তি নেই। কুন্ডুদার ঠাঁই হলো আমার কোঠার ফ্লোরে। তবে সে'ও দিন পনেরো। পরমেশ সেনের হাতে ধরা পড়ে গেল বেচারা। নাস্তানাবুদ হলো। ভেবেছিলাম আমাকেও ঘাঁটাবে কুন্ডুদা কে ওর বালের অফিসার্স চয়েস এ থাকতে দেওয়ায়। কিন্তু আমার চোট টে গেলো সাহার উপর দিয়ে।

এই দিন পনেরো তে দেখলাম কুন্ডুদা আশ্চর্য পাঠক। আগেও, আমার কোঠায় এল বাংলা বইপত্র দেখতো উল্টেপাল্টে। যে কদিন ছিল, প্রত্যেক রাত্রে পড়তো। মেইন লাইট যতোক্ষণ আছে তো পড়েই যাবে। পরে আমি ঘুমালে, আমার টেবিল লাইট নিয়ে পড়তো। আমার সঙ্গে সুলভ সংস্করণ যে বংকিম উপন্যাস সমগ্র ছিল, দুই খন্ডই কুন্ডুদাকে দিয়ে দিলাম। বংকিমের অনেক উপন্যাসই কুন্ডুদার পড়া ছিল। “ভোলগা থেকে গঙ্গা” গিল্লো গোগ্রাসে।… ম্যাগাজিন খুঁজে খুঁজে আমার গদ্য-পদ্য পড়লো।…. এরকম একজন পাঠক যে পাবো জীবনে ভাবিনি। মুখে মুখে নিজ শ্রেণী-চরিত্র ভেঙ্গে বেরোনোর কথা বল্লেও, অবচেতনে যে পেটি বুর্জোয়াত্ব, তা বংশানুক্রমিক।”

দিনের কাজ চলেছে আরম্ভ হ'তে। এরপর সারাদিন আর ফুরসত মিলবেনা —- না স্বপনের, না কুন্ডুদার। ওই কথা ভেবেই বোধহয় কুন্ডুদা আবার বল্লোঃ “কি ইঞ্জিন সাহেব, মনমরা দেখাচ্ছে কেন?” সারাদিন আর ফুরসত মিলবেনা —- না স্বপনের, না কুন্ডুদার। ওই কথা ভেবেই বোধহয় সুকুমারের মনে হলো, সব কথা এদের খুলে বললে কেমন হয়?


৬। খুকাদা

 ৬। খুকাদা

আবার সেই ছাত। রাত। সেই, সিং মহলের  ছাত-প্রান্ত, টাটাবাবার ইস্পাত গলানো হাওয়া আর সুকুমার। রাত যতো গভীর, যতো নিঝুম, টাটাবাবা’র কারখানা বাতি, কারখানা আওয়াজ,ততোই উত্থিত। তথাপি আকাশের নিজস্ব মহিমায়, টাটাবাবার বাত্তির উপরেও ঘন হয় অন্ধকার। ঘন হয়েছে অন্ধকার। চেনা যাচ্ছে কালপুরুষের অবয়ব। কুকুরডাক ভেসে আসছে ট্রাক-থামা, ট্রাক-চালু আওয়াজ ছিঁড়ে। উড়ে আসছে, পিছনের বস্তি থেকে হল্লা-ধ্বনি। হতে পারে মস্তির, হতে পারে ঝগড়ার। নিচের তলা থেকে উড়ে আসছে হাসাহাসি। মাঝে মধ্যে। সাহাবাবুর কোঠা থেকে। নিশ্চিত। এই সাহা এক আজব মাল। সুকুমারের সঙ্গে একা হলেই গল্প করে তার ছোটো মেয়ের। সে রূপসী। সে গৃহকর্মে সুনিপুণা এবং ব্যাচেলার ডিগ্রীর দুর্ভাগ্য, যে , দুইবারেও ডিগ্রীটি হয়ে উঠতে পারেনি সাহাবাবুর ছোটমেয়ের। আবার মাল পেটে গেলেই শোনায়, নানা রাজ্যের নানান শহরের লালবাতি তল্লাটে তার নিজের প্রতাও প্রতিপত্তির কথা। চোখ টিঁপে বলেঃ “আরে আসো না একবার আমার বাড়ি। সোনা, রূপা, হীরা – কতো গাছি যে ঘুড়িয়ে আনবো”। – একে ঘিরে একটা গল্প লেখার তালে আছে সুকুমার।
নিচের তলা থেকে উড়ে আসছে হাসাহাসি। মাঝে মধ্যে। সাহাবাবুর কোঠা থেকে। নিশ্চিত। এগুলি নিত্যকার ব্যাপার। কিন্তু আজ, এই তৃতীয় দফা মস্তিময় হর্ষধ্বনিতে আপনিই তার মুখ দিয়ে বার হয়ে এলো “শালা চুতমারানির পুতেরা”। আদতে ধাবায় খেতে যাওয়ার আগে আর পরে সুকুমার সত্যই দুইজন সুকুমার। নাহ। ধাবা ফেরত সুকুমার ছিল ধাবার দিকে যাওয়া সুকুমারই। খেয়ে এসে কোঠার তালা খোলা, কোঠার লাইট জ্বালানো, মেখে থেকে খাম-পোস্টকার্ড-ইনল্যান্ড তুলে বিছানায় রাখা এবং অতঃপর খামের উপরের হস্তলিপি দেখে, সব আগে বুদ্ধর চিঠিটি খুলে ফেলা। – এতোদূর একজন সুকুমার। তারপর? তারপর বুদ্ধর চিঠি পড়তে পড়তে, ক্রমে, অন্য অন্য সুকুমার হয়ে, চিঠি পাঠান্তে সে সম্পূর্ণ আরেকজন সুকুমার। বা, সে এখন নয় আদৌ সুকুমারই। সতীশ দেবের দুর্ঘটনায় মৃত্যু বা রহস্যময় মৃত্যু, তার লাশের ভেসে ওঠা, ঝিলের জলে, তাড়িত করেনা সুকুমারকে তেমন। হয়তো করতো যদিনা বুদ্ধ’র ইঙ্গিতটি তারও মনে, অবলীল না আসতো। ইঙ্গিতটির অন্তর্গত বিভীষিকার কিনারে এসে নিজেকে টেনে ধরেছে সুকুমার। জানে, এই টেনে ধরা সাময়িক। ওই বিভীষিকায় তাকে হবেই যেতে, তবু অন্তত এই মুহুর্তে সে আটকে গেছে খুকাদা’য়, খোকন দর্জি’তে। খুকাদা মানেই রেল লাইন। আবহে, চালচিত্রে – রেললাইন। রেললাইনের কাটাকুটি। কাটাকুটি খুকাদা’র ললাটে, কপালে, গালে, চোখে, চোখের উপরের চশমা-কাঁচে।
তখনো সেখানে মালগাড়িগুলি ঝিমাতো। একটি লাইনের শরীরে জড়িয়ে আরেকটি লাইন, আরেকটি থেকে আরো একটি –  নির্মাণ করেছে আশ্চর্য ব্যূহ। ব্যূহ ঘিরে রেল দপ্তরের মালগুদাম । ছিল অদ্ভুত এক দমবন্ধ ঘ্রাণ সমস্ত অঞ্চলটিকে ঘিরে। রাধা-দুর্গা এই দুটি সিনেমা হলের  সঙ্গমস্থলে যে পীচরাস্তা, তার দুইধারে মাড়োয়ারিদের দোকান তথা বাস-অট্টালিকা-ভিড়ের কিনার ধরে চলেগেছে গলী – ক্রশিং-হীন লাইন পারহয়ে – আরেক বড় সড়কে। সেই মোহানায় ‘বিপিন পাল স্কুল’। এই রাস্তা সেখানে মিশে বেঁচে যায় হাঁপ ছেড়ে।
সেদিন পূর্ণিমা ছিলনা। তবে পূর্ণিমার ঘ্রাণ ছিল বলে একটা চাঁদ – আশরীর রক্তছোপ নিয়ে উঠে এসেছিল আকাশে। কারেন্ট ছিলনা। টানা কয়েকদিনের বৃষ্টিহীন চালচিত্রে গুমোট ছিল ভিতরে-বাহিরে। যদিও ‘তেলচুরা’কে পাখি বলবার মতই, একে শহর বলাহয়, তথাপি, সেদিন ইলেকট্রিক তার আর লাইনের কিনারে কিনারে ছুটেচলা না-ইলেকট্রিক তারদের কাটাকুটির ঘষাকাঁচে আকাশ হয়েছিল অদম্য নাগরিক। অন্তহীন বিষণ্ণ।
 সে’ই সুকুমারের প্রথম দেখা খুকাদা’র সঙ্গে। ‘খুকাদা’র চর্মচক্ষু যদিও তখন আর ফারাক করতে পারেনা অনেককিছুরই তবু জীবিকা হিসেবে বেছে নিয়েছে দর্জিত্ব। অথবা, যেহেতু এ’ই ছিল তার বাপ-ঠাকুর্দার পেশা, তাতেই ফিরেছিল খুকাদা। নিয়েছে বাসা শহরের ধূসরতম এই ভূগোলে। এ’ই ছিল তার পৈত্রিক বাসস্থান। সেখানেই ফিরেছে খুকাদা। ফিরেছে? কোথা থেকে? ফিরেছে যুদ্ধমাঠ থেকে। কোন যুদ্ধমাঠ? কেন ওই যুদ্ধে গিয়েছিল খুকাদা? – যাওয়ার, যুদ্ধে শামিল হওয়ার হেতু, যুক্তি– সাতাশ বছরের সুকুমারের কাছে যতোটা পরিষ্কার – ততোটা কখনো ছিল কি খুকাদার? সম্ভব ছিল কি থাকা? যদি গিয়েই ছিল যুদ্ধে, তো ফিরেই এলো কেন? ফিরে যে এলো, এই ফিরে আসা বিজয়ীর, বিজিতের না পলাতকের? ব্যাখ্যা করা কঠিন। এই মুহুর্তে আরো আরো কঠিন। ঠিক যেমন কঠিন, ব্যাখ্যা করা      “ কমরেড কানু সান্যালকে জেল ভেঙ্গে ছিনিয়ে আনুন” শ্লোগানের অর্থ। এতাবৎ। এতাবৎ এটুকু স্পষ্ট, যে, বাক্যটিতে “আপনারাই” শব্দটি উহ্য আর উহ্য বলেই বেশী উপস্থিত।
এসেছিলেন একজন এক্স-যোদ্ধা। সহযোদ্ধা, একদা, খুকাদা’র। এসেছিলেন ভিন শহর থেকে। ভিন শহর, কেননা, এই শহরের থেকে তিনি চলে গিয়েছিলেন, যুদ্ধের কোনো এক স্তরে। ভিন শহরে গিয়ে গাঢাকা দিয়েছিলেন। সে অনেকদিনের কথা। সুকুমার-বুদ্ধদের তখন এগারো ক্লাস। সেই প্রাক্তন যোদ্ধা এলেন স্বদেশে। স্ব-মফস্বলে । এসে তাঁর খোয়াইশ জাগল এক্স-কমরেডকে দর্শনের। সেই প্রাক্তন যোদ্ধার পিছু পিছু সুকুমার, বুদ্ধ আর সমর বিজয়ও গিয়ে হাজির হয়েছিল খুকাদা’র আস্তানায়।
মালগাড়ি শান্টিং করার ওই অঞ্চল, যেহেতু বসতিহীন ‘বস্তি’ এবং ছিল লোডশেডিং, সন্ধ্যা থেকেই, তাই মনে হচ্ছিল যেন অনেক রাত। অতঃপর খুকাদা আর তার পরিবারের মুখামুখি দাঁড়ানোমাত্র প্রকৃত মাঝরাত, নিশিডাকা মধ্যরাত ঘিরে ধরেছিল, অন্তত সর্বকনিষ্ঠ এই তিনজনকে। কিছুক্ষণ থেকে, বাকিদের ছেড়ে এই তিনজন চলে এসেছিল। ফিরতি পথে কথা ছিলনা কারোর মুখেই। ছিলনা কারন তাদের ঘিরে, তাদের সঙ্গে সঙ্গে আসছিল হাই পাওয়ার চশমার আড়ালে খুকাদার দৃষ্টি, তার একচালা গার্হস্থ, তার দশকেলাশপাঠরতা কন্যাটির অন্তরে-বাহিরে কৈশোর ছাড়িয়ে যৌবনে উড়ান দেওয়ার সমস্ত লক্ষণ । তিনজনের কেউই বলছিল না কোনো কথা।  চলতে চলতে, হঠাৎই বসে পড়েছিল সমরবিজয়। রেল লাইনেই। দেখাদেখি বসে পড়লো সুকুমার আর বুদ্ধ’ও। সমর বিজয় চোখ বন্ধ করে গেয়ে উঠেছিলঃ
 “ সারাদিন শুধু বাহিরে     ঘুরে ঘুরে কারে চাহি রে, সন্ধ্যাবেলার আরতি    হয় নি আমার শেখা”।
খুকাদা’র সঙ্গে প্রথম সাক্ষাতের ওই ছবিগুলিই আবার আসছে ভেসে। কিছু মাস আগে খুকাদা’র মৃত্যু খবর, যা’ও রহস্যে মোড়া, পেয়েও ওই সন্ধাটিতেই উড়ে গিয়েছিল মন। আজো যাচ্ছে। কিন্তু আজকের যাত্রায়, মন-ডানার বর্শার মতো করে সূঁচ ছুঁড়ে দেওয়ার অনুভব। বুদ্ধ তার চিঠিতে যে ইঙ্গিত দিয়েছে, না দিলেও, ওই একই ইঙ্গিত হয়তো সুকুমার দিতো বুদ্ধকে, সতীশ দেবের আজব-মরা’র খবরটি পেলে। নিশ্চিত একই কথা ভাবতো সমরবিজয়ও। কিন্তু সমরবিজয় কোথায়? কেন এক সময় তাদের থেকে নিজেকে সড়িয়ে নিলো সমরবিজয়?
ভাবতে, এই মুহুর্তে, আর ইচ্ছা করেনা সুকুমারের। সমরবিজয়ের গাওয়া গানটি বেসুরে গেয়ে সে ফিরতে চায় ওই অনেক আগের সন্ধ্যাটিতে। “ সারাদিন শুধু বাহিরে ঘুরে ঘুরে কারে চাহি রে, সন্ধ্যাবেলার আরতি হয় নি আমার শেখা। নিভৃত প্রাণের দেবতা যেখানে জাগেন একা …”। – সুকুমার গায়।
রাত যায়। রাত্রি উড়ে যায়।

Saturday, November 30, 2024

৫। নটী-কথা

 ৫। নটী-কথা

নটীখাল বহিছে মন্থরে।
শোনা যায়,কান-মধু গ্রামের জমিদার, দূর দেশ থেকে আনাচ্ছিলেন এক নর্তকীকে । তাঁর নতুন নাচঘর উদ্বোধন করবার জন্য। বুদ্ধ ভাবে, সেই আমলে এই অঞ্চলে ‘নাচঘর’, নির্ঘাৎ জমিদারটি দেখে এসেছে ঢাকা-কইলকাত্তা গিয়ে। এই তল্লাটেও জমিদারগণ কেচ্ছা কেলেঙ্গকারি, চোটপাট সহ থাকলেও নাচঘরের নিদর্শন নেই। সম্ভবত এই সকল চিরস্থায়ী বন্দ্যোবস্তের পরের আমল, যখন দেশগ্রাম ছেড়ে জমিদারদের শহুরে হওয়া এবং অন্তিমে উচ্ছনে যাওয়ার হিড়িক।
    গল্প-মতে তখন বর্ষার সময়। কথক মামুদালির ভাষায়, ‘জলের দিন’। নর্তকীর নৌকা আসছিল ‘বড় নদী’ দিয়ে। বড় নদী মানে, খুশিয়ারা হয়ে। সপ্তাহ-দুই ভেসে ভেসে নোকা যখন ভিড়লো ঘাটে, তখন নর্তকী নারাজ মাটিতে পা রাখতে। জলে ভাসতে ভাসতে তখন তার জলের নেশা গিয়েছে ধরে।
“হয় নাচঘর অব্দি নৌকায় যাবো নয়তো ফিরে যাবো”। বায়না সুন্দরীর।
এদিকে পাঁজি দেখে, পুঁথি দেখে দিনক্ষণ ঠিক হয়ে আছে নাচঘর উদ্বোধনের। বাবু পড়েছেন ফাঁপরে। কি যায় করা? নৌকায় উঠে হাতে ধরছেন সুন্দরীর, পায়ে পড়ছেন সুন্দরীর। তোফা দিচ্ছেন। মোহর দিচ্ছেন। লিখে দিতে যাচ্ছেন ঘর গেরস্থির কাগজ। কিন্তু সুন্দরী নারাজ। তার এক কথাঃ “হয় নাচঘর অব্দি নৌকায় যাবো নয়তো ফিরে যাবো”।
এই গল্প এখনো বলেন মামুদালি। এখন বৃদ্ধ মামুদালি। বুদ্ধ-সুকুমার’দের শুনিয়েছেন, এই গল্পই, এক দশক আগে, অন্তত ডজন বার। প্রতিবারই গল্পে লেগেছে নতুন নতুন রঙ। হানা দিয়েছে নতুন চরিত্র। অনেকযুগ যাওয়া হয়না – না “সেটেলমেন্ট বাজার”, না’তো মামুদালি’র চা-বিস্কুট-ঘুঘনীর দোকানে।
বাবু জমিদারটি যখন নিরুপায় হয়ে প্রায় ঝাঁপ দেন খুশিয়ারার জলে তখনই এক জোয়ান মদ্দ এসে হাজির। সে বল্লো “উপায় করে দিতে পারি। কিন্তু শর্ত আছে”।
“বাবা, মাথা খাও, যা ইচ্ছে তা’ই নাও। বলো কি উপায়?”
“রাতারাতি খাল কেটে নৌকা নিয়ে যাবো আপনার নাচঘরে।”
“পারবে?”
“নিচ্চয় পারবো। না পারলে কান কাটবেন। তবে –“
“তবে আপনার নটীর সঙ্গে এক রাত ...।”
বাবুটির বুক ফাটলো। তবু বল্লেন “ কিন্তু, মানে,ও রাজি না হলে... মানে, খুব জিদ্দি মেয়েলোক কি’না। দেখতেই ত পাচ্ছ...”
“হক্‌ কথা। আমিও জোর কিছু করবো না। “না” বল্লে না-ই সই। ” আর কিছু না বলে সোজা উঠে গেলো নর্তকীর নাও’ এ। তার হাবভাব দেখে কেউ সাহস করলোনা আটকানোর।
এই বীর, মামুদালির গল্পে, মুসলমান আবার একই কিচ্ছায়, সন্তর বাজারের হরি পালের মুখে, ওই বীর-জন “হাট্টা-গাট্টা, পইতা পড়া বাবন। ব্রাহ্মণ ছাড়া এমন দম আর কার হইব?” – কিন্তু কথক হরি পাল তো নয় ব্রাহ্মণ। “এখানেই গ্রামসী’র হেজিমনি’র কথাটা বুঝতে হবে।” জেঠু বলেছিলেন। দিয়েছিলেন বুঝিয়েও।
মুসলমান হোক আর বাবনই হোক, ওই “বীর” উঠে গেলো নর্তকীর নৌকায়। তার দেখা হলো নর্তকীর সঙ্গে। কিন্তু কথা কি’যে হলো, কি’যে ঘটলো অন্দরে – জানলোনা কেউ। বার হলে এলো মানুষটি। চলে গেলো। ফিরে এলো একটু পরেই। ঘন্টার মধ্যে। সঙ্গে হাজার লোক নিয়ে ফিরে এলো। “পাহাড়ি কুলি এরা। ইখানর মাইনষে চিনইন না তারারে”। ফুটনোট মামুদালি’র। ওই হাজার হাত লেগে পড়লো খাল কাটার কাজে। পরদিন ভোরের মধ্যে খাল, জলের নূপুর বাজিয়ে দিয়ে, নাচতে নাচতে হাজির হলো বাবুর নাচঘরে। সারারাত জেগে জেগে পরিশ্রান্ত বাবু যেন নতুন জওয়ানী পেয়ে উঠে এলেন। দৌড়ে গেলেন নৌকার অন্দরে।
 “কি গো সুন্দরী, কই গো সুন্দরী...”

সাড়া নেই।
কোথায় সুন্দরী?
দেখাগেলো দাসীগুলি ঘুমে অচেতন।
সুন্দরীর খাঁচা ফাঁকা। পক্ষী নেই। নেই  খাল কাটার দায় মাথায় নেওয়া জোয়ান-মদ্দটিও।
তারপর, কোনো গল্পে, মামুদালিরই কোনো কোনো ভার্সনে, জমিদারবাবুটি দিল গলায় ফাঁস, মতান্তরে, সব ছেড়ে বার হয়ে গেলো সন্ন্যাসী হয়ে।
“তাহলে তো ওই লোকটা চোর। অন্যের মেয়েমানুষ নিয়ে পালালো”। – এই যুক্তি তুলেছে সুকুমার, মামুদালির কাছে, তুলেছে হরি পালের কাছে। মোদ্দা, সে দেখতে চায়, ওই “বীর” যদি “চোর” হয় তাহলে একে নিজ নিজ জাতের উল্কি দিয়ে, নিজ নিজ জাত’কে উচ্চাসন দেন কিনা কথকেরা। আর কথকেরা, উভয়েই, ঐ প্রশ্নের মুখামুখি এসে, দিয়েছেন একই উত্তর “আরে নাহ্‌, অই বেটা জমিদার মানুষ ভালা আসিল না। আগেও অনেক বেটি রে আনাইয়া গুম-খুন করাইসে”। –  তবে কেউ-ই, কখনোই, ওই তথ্যটি নিজে থেকে আনেননা গল্পে।
নটী গেলো। বাবুও গেলেন। কিন্তু রয়ে গেলো এই খাল। নটী খাল।
সেই নটীখালই, আজো, বহিছে মন্থরে। তার কিনারের গঞ্জ-গ্রামের সরল-মন্থরতা তার চলাতেও।
মন্থর? হয়তো ঠিক। কিন্তু সরল? অদ্যাপি? মানতে পারেনা বুদ্ধ। সতীশ দেবের লাশ প্রসঙ্গ আর তার সঙ্গে খোকাদা’র রহস্যময় মৃত্যুর মধ্যে যে যোগটির কথা, কিছু সময়ের নিমিত্ত, চলে গিয়েছিল মন, মগজের পিছন বেঞ্চিতে, তা’ই আবার দখল নেয় ফার্স্ট বেঞ্চের। বেঞ্চিতে, এর কিনারেই, কেন যে এসে বসে, বসছে বারবারই, একটি শীতের রাত,
একজন  মাতালের ঘোষণা “ভেঙ্গে গেছে। দেওয়াল ভেঙ্গে গেছে। শালা’রা শেষ। শালারা পুরাপুরি শেষ, ইন্টারনেশনেলি ডুম্‌ড ”...।

৪। নটীখাল বহিছে মন্থরে

 ৪। নটীখাল বহিছে মন্থরে



সুকুমারের মনে পড়লো মুখ, বাদল ভটের মৃত, পুঁটি-বাবু-ঘোষিত, “ইন্টারন্যাশন্যাল” কন্যাটির। 

তাঁবুর মতো খাটানো এই ধাবা। দশ দিক খোলা। ফলে টাটাবাবার ইস্পাত-গলানো-হাওয়া এখানেও ঢুকেপড়ে। তোলপাড় তোলে। উড়িয়ে নিয়ে যায় শালপাতা। উল্টে দিয়ে যায় হিসাব খাতা। দুলিয়ে দিয়ে যায় শো-পাঁচশো পাওয়ারের বাল্ব গুলি যাদের চোখ জ্বলে, বড় রাস্তার ইলেকট্রিক লাইন থেকে “হুক” মেরে আনা বিদ্যুতে। এখানের ভাষায় “কাটিয়াবাজি”। ধাবার যে মুখ হাইওয়ের দিকে, সেদিকে থেমে থাকে লরীর, ট্রাকের দল। চালক-দল নামে ধাবায়। রোটি-তড়কা খায়, রোটি-মুর্গা খায়, রোটি-শব্জি খায়, দারু খায়, চাবলও খায়। খেতে খেতে অনেকেরই চোখ চলে যায় সরু-রাস্তা বা সদর রাস্তার অনশকারে। সেখানে, অন্ধকারের সঙ্গে মিশে থাকা রোড-রেন্ডি দের খুঁজে নেয় দৃষ্টি। অপর পক্ষের দৃষ্টিও চিনে নেয়, কারা ডাকবে, কারা আসবে। আর সকল কিছুর গন্ধ ছাপিয়ে ম’ম’ করে রসুন-গন্ধ। শো-পাঁচশো পাওয়ার বাল্বদের কিনারেই ঝোলে তিনিটি-চারটি রেডিও। এক রেডিওর আওয়াজে বেড় দেওয়া যায়না গোটা চত্বর। সব রেডিওতেই বাজে একই স্টেশন। বাজে দিন রাত। যেমন এই মুহুর্তে, এই তিন চারজন মিলিয়ে প্রথমে ঘোষণা দিলোঃ “ফরমাইশ হ্যায় আপ কিঃ রাম পুর সে চিরাগ,রুস্তম, সাবিনা। রানীগঞ্জ সে পুলক, মিঠু, চিত্রা। আসাম সে …”। এইবার এরা, একত্রে, গেয়ে ওঠেঃ “ য়ে দিল্‌, হ্যায় মুশকিল জী’না ইঁয়াহা, জরা হটকে, জরা বাঁচকে, ইয়ে হ্যা বোম্বে মেরী জান”। সুকুমারের কিনারে, কাঠ বেঞ্চিতে এসে বসে দুই সর্দারজী ড্রাইভার। একজনের, যে বয়সে, স্পষ্ট ভাবেই বড়, দৃষ্টি উড়ে যায় রোড-রেন্ডি’র খোঁজে। “থালি” অর্ডার করা হয়ে গিয়েছে সুকুমারের। এবার সে একটি সিগারেট জ্বালায়। “থালি”র, শালপাতার থালায়, আসতে দেরী আছে। অন্তত পনেরো মিনিট তো বটেই। অন্য দিন হলে সে উদাস-ভান করে ঠিক লক্ষ্য করতো ওই দুই ট্রাক চালককে। টুকে নিতে তাদের নানান ডিটেল, মনে মনে। কিন্তু আজ আরকে জৈন, বাদল ভটের মড়া মেয়ে’র মুখ আর বাবলু বিশ্বাসের মাতাল কন্ঠে “ভেঙ্গে গেছে। দেওয়াল ভেঙ্গে গেছে। শালা’রা শেষ। শালারা পুরাপুরি শেষ, ইন্টারনেশনেলি ডুম্‌ড ” – সুকুমারকে ঘিরে আছে। ঠিক যেমন তখনো, তার চিল-ছাত-কোঠার বন্ধ দরজার ওই পাড়ে, ইস্পাত গলানো টাটাবাবা-হাওয়ায় উল্টেপাল্টে যাচ্ছে ওই খামটি, যা’তে রয়েছে সংবাদ – পাহাড়িয়া শহর খারলং’এর খারনাই লেকের জলে, খারলং পাব্লিক হেলথের বড় সাহেব সতীশ দেবের লাশ ভেসে উঠবার। 

সেই খামের প্রেরকজন, সেই সংবাদের পরিবেশক-জন – তখন হাঁটছে। মফস্বলের রাস্তা ধরে হেঁটে চলেছ্রে ঘরমুখো। নিত্যদিনই এই সময় তার এই ফেরা। এই রাস্তাচলা। রাত তখনো দশটার কাঁটা না ছুঁলেও স্টেশন শুনশান আর ঐ শুনশানের ভিতরে, ইস্টিশান-সিঁড়ির নিচে, গাছতলায়, অন্তত দুইজন রিক্সা চালক হাজির। নিত্যই। কিন্তু তারা এই মানুষটির দিকে তাকায় না। এই ছোকরা, এরা সকলেই জানে, হেঁটেই যায়। আস্তেধীরে, হেলেদুলে, হেঁটে যায়। সেদিনও এমনি, একটি চারমিনার সহ আস্তেধীরেই হাঁটা ধরেছিল বুদ্ধ। ভাবছিল সুকুমারকে পাঠানো চিঠিটার কথাই। পৌঁছলো কি? পৌঁছলে নিশ্চয় ফোন করবে সুকুমার। কিন্তু আজ সারাদিনও কোন ফোন আসেনি অফিসে। ফোন করেছিল বুদ্ধ নিজেও। দুইবার। একবার সুকুমারের অফিসে। অফিস টাইমে। আরেকবার, ফেরা-টাইমে, রাতে, সুকুমারের বাড়ি-মালিকের ফোনে। না পেয়ে নাম বলেছিল নিজের। বলেছিল সুকুমারকে জানাতে। বলতে, ফোন করতে। কেজানে, হয়তো কেউ-ই জানায়ই নি সুকুমারকে। 

আনমনে ঘড়ি দেখলো বুদ্ধ। রাত দশটা পেরিয়ে গেছে। মফস্বল শহর ঘুমিয়ে পরেছে ন’টা বাজতেই। রাস্তার কিনারের চল্লিশ পাওয়ারের বাল্বগুলিরো অনেকে ঘুমে। শিবুদার সাইকেল আর সাইকেল রিক্সা রিপেয়ারিং এর দোকানও বন্ধ। বুদ্ধ তবু দাঁড়িয়ে গেলো বন্ধ ওই দোকানের বারান্দায়। অপেক্ষা জেঠু কখন বেরোবেন আড্ডা সেড়ে। মোড় পেরিয়েই ‘মহানায়ক’ পত্রিকার অফিস। ওখানে বসে আড্ডা, শহরের ‘বড়’দের। এই আড্ডাকে বলা হয় ‘রাষ্ট্রসংঘ’। আড্ডা সেড়ে হেঁটে হেঁটে বাড়ি ফেরেন  জেঠু। এই রকম সময়েই। ওই  সময়টা  তাঁর সঙ্গ ধরার চেষ্টা করে বুদ্ধ। কিন্তু আজ কি খুব বেশি দেরী হয়ে গেলো যে “রাষ্ট্রসঙ্ঘ”ও গেছে বন্ধ হয়ে? সামান্য উঁকি দিয়ে দেখবার চেষ্টা নেয় বুদ্ধ। নাহ, আলো জ্বলছে তখনো। দেখা যাক আরো মিনিট দশ। আরেকটা সিগারেট জ্বেলে নেয় বুদ্ধ। তার চাকরি নীলাম বাজারে। সুকুমারের মতে “যে বাজার হইতে কোহিনূর হীরা খরিদ করা হইয়াছিল”। চাকরীসূত্রে সেখানে একটি বাসস্থানও প্রাপ্য বুদ্ধ’র। কিন্তু মন টেঁকেনা। করিমগঞ্জ থেকেই সে করে যাতায়াত। “ডেইলী প্যাসেঞ্জারী”। জেঠু  রিটায়ার করেননি এখনো।  ফলে দিনে তাঁকে পাওয়া যায়না প্রায়। ছুটির দিনে গেলেও একা পাওয়া মুশকিল। কেউ না কেউ থাকেই তাঁর কাছে। ফলে রাতের ঐ নিঝ্‌ঝুম সময়টুকুর অধিকার বুদ্ধ ছাড়তে চায়না সচরাচর।

রাষ্ট্রসংঘ’ আড্ডা সদ্য শেষ। বোঝা যায়। কারন যে  মানুষটিকে দেখাযায় স্কুটারে চাপতে, তাঁর পরে আর একজনই থাকে বাকি। জেঠু। ।  পানুবাবুর স্কুটার স্টার্ট নিতে নিতেই দেখা যায়  পাজামা-পাঞ্জাবী পরিহিত, একজন লম্বা মানুষ, মুখে জ্বলন্ত সিগারেট নিয়ে বার হয়ে এলো রাষ্ট্রসংঘ থেকে। হাঁটতে হাঁটতে এগিয়ে এলো মিশন রোডের মোড়ের দিকে। ওই মানুষ – জেঠু। ঐ জ্বলন্ত সিগারেট– চারমিনার। বুদ্ধ তার প্রায় সদ্য জ্বালানো চারমিনারটা পায়ে পিষে নিভিয়ে দিয়ে এগিয়ে যায় তাঁর দিকে। ডাক দেয় ‘জেঠু’ ।

জেঠু থামেন। বলেনঃ ‘ও, তুই আইস্‌স – চল্‌’।

শুরু হয় পথচলা। কথায় কথায়। 

কথা। কতো কথা। আজ। অন্য দিন। সব দিন। 

কি কথা এতো সদ্য যৌবন ছোঁয়া এক যুবক আর ষাটের কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়া এই মানুষটির?

কথা। তবে কাজের নয়। অ-কাজের।

-কাজের? কাজ আর অ-কাজের, -কাজ আর কু কাজের সংজ্ঞা গুলি, দূরত্ব, ভেদরেখাগুলি স্পষ্ট নয় বুদ্ধর কাছেও। তবে সুকুমার বা সমরবিজয় দিগের মতো সব সংজ্ঞার মুখামুখি দাঁড়িয়ে, বাইরে, চ্যালেঞ্জ করেনা বুদ্ধ। সে ভাবে। ভাবে, যেমন এই মুহুর্তে, মাণিক বন্দ্যোপাধ্যায়, তারাশংকর, বিভূতিভূষণ, ফ্রেজারের ‘গোল্ডেন বাউ’, মানবেন্দ্র নাথ রায় থেকে মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধায়, শিবনাথ শাস্ত্রি’র শিশুদের জন্য রচনা থেকে প্রেমেন মিত্তির, লীলা মজুমদার হয়ে সত্যজিৎ রায় অথবা  ‘বোমার ভয়ে বার্মা ত্যাগ’হেন না শোনা নাম, না-জানা কাহিনী – এ সকল যদি অ-কাজের হয়, তবে “কাজ” ঠিক কোন জিনিস? জেঠু যদিও ইতিহাসের পন্ডিত, ইতিহাস কেন্দ্রীক লেখালেখি ও গবেষণার জন্যই তাঁর মূল খ্যাতি তথাপি তিনি প্রকৃত প্রস্তাবে সাহিত্যেরি মানুষ। সিগারেট ও তাঁর নিজের সম্পর্ক নিয়ে লেখা গদ্যটি বুদ্ধ ফোনে পড়ে শুনিয়েছিল সুকুমারকে। সুকুমার পরে, শোনায় সময়বিজয়কে।

শুরু হয় পথচলা। কথায় কথায়। হাঁটতে হাঁটতে। সতীশ দেবের লাশ প্রসঙ্গ আর তার সঙ্গে খোকাদা’র রহস্যময় মৃত্যুর মধ্যে যে যোগটির কথা ভেবেই শিউরে উঠেছিল বুদ্ধ, তুলি-তুলি করেও ওই কথাটা তোলেনা বুদ্ধ। কেন কে জানে। তার চিঠি পেয়ে সুকুমারও কি শিউরে উঠবে? ভাববে একই কথা

কথায় কথায়, হাঁটতে হাঁটতে – আসছে, চলে যাচ্ছে বনমালী রোডে যাওয়ার বাঁশের সাঁকো, রেশন-দোকানের মুখোমুখি বাঁশঝাড়, থানা-টিলা, নীচের যমজ বট। তারপর বাঁদিকে পর পর দুটো গলী। মধ্যে পুকুর। দ্বিতীয় গলীটি গিয়ে মিলেছে নটী খালের সমান্তরাল লঙ্গাইরোড গামী রাস্তায়। ঐ গলীরি প্রান্তে ‘দুলাল কুঠি’। জেঠুদের বাসা। তরজা-বেড়ায় ঘেরা। বাঁশের গেট। ওই গেটের সামনে দাঁড়িয়ে আরো কিছুক্ষন গল্প-গাছা। তারপরে জেঠু ঢুকে যান গেট ঠেলে।

 বুদ্ধ আবার  সিগারেট ধরায়। হাঁটে। মর্মে সুকুমারকে পাঠানো চিঠিটার কথাও হাঁটে। আর এই হাঁটার পাশে পাশে, ‘Quiet Flows The Don’? নাহ।   

নটীখাল বহিছে মন্থরে।




Friday, November 29, 2024

৩। দেওয়ালের প্রবেশ

৩। দেওয়ালের প্রবেশ



পরীক্ষা শেষ হয়। শেষ হয় “ড্রইং” আর “হস্তলিপি” দিয়ে। আসে আরকে জৈনের ফাইন্যাল। বাবার সঙ্গে গিয়ে একদিন তারা দুইভাই দেখে আসে সেই ফাইন্যাল ম্যাচ – আসাম পুলিশ আর মণিপুর রেজিমেন্টের খেলা। বাঁশের বানানো প্রতিটি টিকিট ঘরের সামনের ভিড়ই উপ্‌চে ওঠে চলেগেছে হয় বড়ো রাস্তায় নয়তো সিভিল কোর্টের আঙ্গিনা পেরিয়ে। মাঠের পাশেই ছোট্ট টিলা। সেখানেই ডাক বাংলো। টিলার যতোটা সম্ভব টিন দিয়ে ঘেরাও করা হলেও টিলায় ঊঠে পরেছে বিন্‌টিকিটের দর্শকেরা। ভিড় জমেছে সিভিল কোর্টের ছাতেও। শীত দুপুরের রোদের মায়া আলস্যের মতো ছড়িয়ে রয়েছে সর্বত্র। ভিড়ের আশে পাশে,ভিড়ের খাঁজে খাঁজে খুলেগেছে পানবিড়ির দোকান, এসেছে ‘জাটিঙ্গার কমলা’র ফিরিওয়ালা-ফিরিওয়ালির দল। কমলার ঘ্রাণ ছড়িয়ে পরছে বাতাসে।

           সিমেন্টের গ্যালারীর পিছনে পাকা রাস্তা। তার ওপারে ‘ট্রেজারী অফিস’। সেই অফিসের বারান্দায় কমলা হাতে দুইভাইকে দাঁড় করিয়ে রেখে বাবা গেলো টিকিট করতে। ফিরে এলো সিমেন্ট-গ্যালারীর প্রায় সামনের দিকের তিনটে টিকিট নিয়ে। তখনো মফস্বলে ইস্কুল-কলেজের মাষ্টারমশাইদের এটুকু সন্মান ছিলো যে তাদের কে ভিড়ে দাঁড়াতে দেখলে ছাত্র বা প্রাক্তন ছাত্রেরা এসে খোঁজখবর নিতো কিংবা বাসে ট্রেইনে ছেড়ে দিতো সীট। সুকুমারদের বাবারো কোনো প্রাক্তন ছাত্রই বাবাকে যোগাড় করে দিয়েছিল ঐ টিকিট তিনটি । নতুবা ফাইন্যালের দিনে সিমেন্ট-গ্যালারীর টিকিট পাওয়া ছিল সর্বৈব অসম্ভব। বাবার নেতৃত্বে, ভিড় ঠেলে তারা ঢুকতে লাগলো ভিতরে আর চালচিত্রে বাজছে “ও রামা রামা রামা , রামা রামা রে” …।

রামা রামা রামা রামা” ? কিন্তু ঐ গানের অন্দরে এই কথা গুলি কে দিল ঢুকিয়ে “দর্দ বন্‌ কে যো মেরে দিল মে রহা ঢল্‌ না সকা, জাদু বন্‌ কে যো তেরে আঁখো মে রুকা, চল না সকা” …। গোলমালে পড়ে গেলো সুকুমার। টাটাবাবা শহর ছাড়িয়ে সে ছিল অনেক অনেক দূরে। হয়তো অন্য গ্রহেই ছিল সে। এইবার টের পেলো আবহে শীত নয়, গরম বাতাস। টাটাবাবার ইস্পাত-পোড়ানো বাতাসে সে দাঁড়িয়ে আছে সিং-মহলের ছাতে। টের পেলো ইথারের তরঙ্গে ভেসে তালা্ত মমুদ এসে আটকা পড়েছেন রাজকুমার সিং’ এর  চার-বড়-ব্যাটারীর রেডিওতে। তাহলে কি তাকে ফিরতে হবে? এখুনি? এই গ্রহে? টাটাবাবার গ্রহে? ছাত পার হয়ে গিয়ে দাঁড়াতে হবে দরজার সামনে? চাবি ঘুড়িয়ে এখুনি খুলতে হবে তালা? তুলে নিতে হবে মেঝেতে এলোমেলো শুয়ে থাকা খাম, ইনল্যান্ড, পোস্টকার্ড গুলি? জেনে নেবে ওই খবর, পাহাড়িয়া শহর খারলং’এর খারনাই লেকের জলে, খারলং পাব্লিক হেলথের বড় সাহেব সতীশ দেবের লাশ ভেসে উঠেছিল? নাহ্‌, ছাত পার হয় না সুকুমার। চাবি পকেটে নেমে যায় সিঁড়ি দিয়ে। পেটে চিনচিনে খিদে নিয়ে সে গেট খোলে। সামান্য এগিয়ে, যায় তার নিত্য-রাতের ধাবা’তে। ধাবা’র দূরত্ব ওই গানের চেয়ে কম। সুকুমার টের পায়। কারন ধাবা-রেডিওতে তখনো তালাত মামুদ। তখনো “গা’য়ে যায়ূংগা বোহি গীত মে তেরে লিয়ে, জ্বলতে হ্যায় জিসকে লিয়ে”। গানটির কিনার দিয়ে ঢুকে যায় সুকুমার।  সিমেন্টের বাঁধানো গ্যালারী মাত্র একটাই। তাই মাঠ ঘিরে বানানো হয়েছে বাঁশের গ্যালারী। রয়েছে দাঁড়িয়ে দেখার ব্যবস্থাও। সিমেন্টের গ্যালারীর একপাশে শামিয়ানা টাঙ্গিয়ে ‘ভি আই পি লাউঞ্জ’। ‘ভি আই পি’ বলতে শহরের ডি সি, এস পি, বরফ কলের মালিক মনোরঞ্জন বণিক, মাড়োয়ারি ব্যবসায়ী সমিতির হোমড়া চোমড়া ক’জন আর কোথাকার দুজন এমপি না এমএলএ । তাদের সামনে রাখা সার সার কাপ্‌-শীল্ড। আজকের খেলার শেষে হবে পুরষ্কার বিতরণী অনুষ্ঠান। তারি স্পেশাল ঘোষক হিসাবে শিলচর থেকে আনানো হয়েছে  কোন্‌ এক ‘দাদা’কে  যিনি শিলচর-করিমগঞ্জ-হাইলাকান্দিতে ‘গলাদা’ নামে সুবিখ্যাত। 

          ভিড়ের মধ্যে কোনোক্রমে জায়গা করে বসে পড়াগেলো। মাইকের গানও থেমেগেলো একসময়। দুই দলের খেলোয়াররা এসে দাঁড়ালো মাঠের মাঝামাঝি। হর্ষধ্বনিতে ফেটে পড়লো দর্শকদল। সুকুমার আর সোমকও যতোটা সম্ভব চীৎকার করে নিলো এই সুযোগে। রেফারীর বাঁশিতে আরম্ভ হলো খেলা আর তখনি সুকুমারের গেলো মন খারাপ হয়ে। - এই  খেলার পরেই আর কে জৈন শেষ! মাইকের গান বন্ধ! সে শিউড়ে উঠলো এইকথা ভেবেো, যে পরীক্ষার রেজাল্টও বেরোবে একদিন। অনতিদূরেই।         

            দুই এক গোলে আসাম পুলিশকে হারিয়ে কাপ নিলো মণিপুর রেজিমেন্ট।

 না’কি ঘটলো ঠিক উল্টোটাই

ধাবার কাঠ-বেঞ্চিতেবসে আজ আর মনে পড়েনা। মনেপড়ে  আলো কমে আসছে বলে পুরষ্কার বিতরণীর জন্য জ্বালানো হলো বড় বড় লাইট। মফস্বলে বলা হতো ‘ফ্লাড্‌ লাইট্‌’।  কিন্তু মাথার উপরে হিম পড়ে ঠান্ডা লাগতে পারে বলে বাবাসুকুমার-সোমক কে নিয়ে ফিরে এলো পুরষ্কার বিতরণী শেষ হওয়ার আগেই। রিক্সা পাওয়া গেলোনা বলে পুরো রাস্তাই আসতে হলো হেঁটে। পাড়ায় ঢুকে মনেহল কি যেন নেই। যেন আরো মিট্‌মিটে হয়েগেছে বাড়িঘরের ষাট কিংবা আশি পাওয়ারের বাল্বগুলি। ... ...শেষ হয়েগেলো আরকে জৈন। এখন, ক্রমে খুলে নেওয়া হবে ঢেউ-টিনের ঘেরাটোপ, তাদের ইস্কুল-মাঠ ঘিরে। উঠে যাবে অস্থায়ী টিকিট ঘর, তাঁবু। ইস্কুলের কোঠা খালিকরে চলে যাবে খেলোয়াড়ের দল।  ইস্কুলের আশেপাশে,পথে ঘাটে, পড়ে থাকবে টিকিটের ছেঁড়া টুকরো,পোষ্টার। সে’ও কিছুদিন, কয়েকদিন। তারপর তাদেরো উড়িয়ে নিয়ে হাওয়া, বাতাস, বৃষ্টি, বাদল। 

বাদল ভটের মেয়ে কি তবু থেকে যাবে ইন্টারনেশন্যাল হয়েই

 বাদল ভটের ওই মেয়েটি মারা গেলো ওই বছর কিংবা বড়জোর আরো এক দেড় বছর পরে। এলো, গেলো আরো শীত, আরো আরকে জৈন টর্নামেন্ট। কিন্তু পরীক্ষার সঙ্গে আরকে জৈনের চার মাসের ফারাক স্থির হয়ে গেলো পরের বছর থেকেই। কে জানে পরের আরকে জৈন বছর গুলিতে আর কোন্‌ কোন্‌ মেয়ে, কার কার মেয়ে, আদৌ কোনো মেয়ে আদপেই “ইন্টারন্যাশন্যাল” হতে পেরেছিল কি’না। তবে “বাদল ভটের মেয়ে এখন ইন্টারনেশনেল” এই ঘোষনার মতোই আরো একটি ঘোষনা সাইরেন-হেন শোনা গিয়েছিল আরেকবার। এক মধ্যরাত্রে। ঘোষক-কন্ঠ মদে চোবানো হলেও, এ’যে মাতাল বাবলু বিশ্বাস, তা নিশ্চিত বলে দিতে হয়নি কাউকে। প্রাক্তন ওয়ার্ড কমিশনারটি বাড়ি ফিরতো মধ্যরাত্রি কে ছিঁড়ে, প্রতি রাতেই। তবে এমতো উৎফুল্ল ঘোষণা সচরাচর শোনেনি পাড়ার লোক। রাত্রিটি শীতের। ঘন, জমাট কুয়াশার। বাঁশ-পাতা থেকে টুপটাপ শিশির-ঝরার। শহরেরো সারা গা’য়ে কুয়াশা-মশারি। সেই মশারি ছিঁড়ে গেলো বাবলু বিশ্বাসের মাতাল কন্ঠে “ভেঙ্গে গেছে। দেওয়াল ভেঙ্গে গেছে। শালা’রা শেষ। শালারা পুরাপুরি শেষ, ইন্টারনেশনেলি ডুম্‌ড ”...। ইত্যাদি। এই ঘোষণার কেন্দ্রে, যা বোঝা গেলো একটি দেওয়াল ও তার ভেঙ্গে যাওয়া এবং সেই ভেঙ্গে যাওয়ার মূল্যে কোনো “শালা” রা “ইন্টারনেশনেলি শেষ”। 

এই দেওয়ালটি ও তার ভেঙ্গেপড়ার প্রচার, এইভাবেই, সত্য-মিথ্যা, বোঝা-না বোঝা মিলিয়েআরো বহু বহু মাতাল, বিশ্বময় ছড়িয়ে দিয়েছিল তখন। একদল ওই মাতাল বাবলু বা পুঁটি-বাবু’র মতোই নেচে উঠেছিল “শালারা ইন্টারনেশনেলি শেষ” বলে। আরেকদল, বা আরো অনেক দলই নিজ নিজ বৃত্ত-দাদা’দের অথবা পার্টির সেন্ট্রাল কমিটির মুখ চেয়েছিল ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের আশায়। 

তখনকার মফস্বলে ডিটিপি ছিলনা। ফলে, সেই “বড়ো এবং “প্রতিষ্ঠিত” পত্রিকা-মালিকদের ভাষার যা অদ্যকার “মাশরুম লোকাল”, সেই পত্রিকাগুলি ছিলনা। ছিল বাসি কলকাত্তাই পত্রিকা । সেই সকল “বড়” পত্রিকা দিগের দ্বারা ঘোষিত ও প্রতিষ্ঠিত “ইন্টেলেকচুয়াল” দের মতামত, ওই সব কাগজের ভাষায় আউড়ে যাওয়াই, মুষ্টিমেয় কয়েকজন বাদে, ছিল “বুদ্ধিজীবিত্ব”।  সটীক কলকাত্তাই মুদ্রিত ভার্সনের আগেই অবশ্য ইথার বাহিত হয়ে সংবাদটি পৌঁছে গিয়েছিল প্রকৃত পিপাসুদের কাছে। সেই পিপাসু তথা নিজ মগজকে নিজস্ব ভাবে প্রয়োগ ক্ষমতার অধিকারীদের সংখ্যা ছিল অতি নিগণ্য। ফলে , দিন দুই বাদে, কলকাত্তাই “নিউজ পেপার” গুলিই মফস্বলের হাটে হাঁড়ি ভাঙলো। ‘খাস’ খবর কে “আম” করে দিল। সেই  মধ্যরাত্রেই বাবলু মাতালও দিয়েছিল ওই রায় “শালারা শেষ। ইন্টারনেশনেলি শেষ”। 

সুকুমারের মনে পড়লো মুখ, বাদক ভটের সেই মৃত, পুঁটি-বাবু-ঘোষিত, “ইন্টারন্যাশন্যাল” কন্যাটির।