Sunday, December 1, 2024

৬। খুকাদা

 ৬। খুকাদা

আবার সেই ছাত। রাত। সেই, সিং মহলের  ছাত-প্রান্ত, টাটাবাবার ইস্পাত গলানো হাওয়া আর সুকুমার। রাত যতো গভীর, যতো নিঝুম, টাটাবাবা’র কারখানা বাতি, কারখানা আওয়াজ,ততোই উত্থিত। তথাপি আকাশের নিজস্ব মহিমায়, টাটাবাবার বাত্তির উপরেও ঘন হয় অন্ধকার। ঘন হয়েছে অন্ধকার। চেনা যাচ্ছে কালপুরুষের অবয়ব। কুকুরডাক ভেসে আসছে ট্রাক-থামা, ট্রাক-চালু আওয়াজ ছিঁড়ে। উড়ে আসছে, পিছনের বস্তি থেকে হল্লা-ধ্বনি। হতে পারে মস্তির, হতে পারে ঝগড়ার। নিচের তলা থেকে উড়ে আসছে হাসাহাসি। মাঝে মধ্যে। সাহাবাবুর কোঠা থেকে। নিশ্চিত। এই সাহা এক আজব মাল। সুকুমারের সঙ্গে একা হলেই গল্প করে তার ছোটো মেয়ের। সে রূপসী। সে গৃহকর্মে সুনিপুণা এবং ব্যাচেলার ডিগ্রীর দুর্ভাগ্য, যে , দুইবারেও ডিগ্রীটি হয়ে উঠতে পারেনি সাহাবাবুর ছোটমেয়ের। আবার মাল পেটে গেলেই শোনায়, নানা রাজ্যের নানান শহরের লালবাতি তল্লাটে তার নিজের প্রতাও প্রতিপত্তির কথা। চোখ টিঁপে বলেঃ “আরে আসো না একবার আমার বাড়ি। সোনা, রূপা, হীরা – কতো গাছি যে ঘুড়িয়ে আনবো”। – একে ঘিরে একটা গল্প লেখার তালে আছে সুকুমার।
নিচের তলা থেকে উড়ে আসছে হাসাহাসি। মাঝে মধ্যে। সাহাবাবুর কোঠা থেকে। নিশ্চিত। এগুলি নিত্যকার ব্যাপার। কিন্তু আজ, এই তৃতীয় দফা মস্তিময় হর্ষধ্বনিতে আপনিই তার মুখ দিয়ে বার হয়ে এলো “শালা চুতমারানির পুতেরা”। আদতে ধাবায় খেতে যাওয়ার আগে আর পরে সুকুমার সত্যই দুইজন সুকুমার। নাহ। ধাবা ফেরত সুকুমার ছিল ধাবার দিকে যাওয়া সুকুমারই। খেয়ে এসে কোঠার তালা খোলা, কোঠার লাইট জ্বালানো, মেখে থেকে খাম-পোস্টকার্ড-ইনল্যান্ড তুলে বিছানায় রাখা এবং অতঃপর খামের উপরের হস্তলিপি দেখে, সব আগে বুদ্ধর চিঠিটি খুলে ফেলা। – এতোদূর একজন সুকুমার। তারপর? তারপর বুদ্ধর চিঠি পড়তে পড়তে, ক্রমে, অন্য অন্য সুকুমার হয়ে, চিঠি পাঠান্তে সে সম্পূর্ণ আরেকজন সুকুমার। বা, সে এখন নয় আদৌ সুকুমারই। সতীশ দেবের দুর্ঘটনায় মৃত্যু বা রহস্যময় মৃত্যু, তার লাশের ভেসে ওঠা, ঝিলের জলে, তাড়িত করেনা সুকুমারকে তেমন। হয়তো করতো যদিনা বুদ্ধ’র ইঙ্গিতটি তারও মনে, অবলীল না আসতো। ইঙ্গিতটির অন্তর্গত বিভীষিকার কিনারে এসে নিজেকে টেনে ধরেছে সুকুমার। জানে, এই টেনে ধরা সাময়িক। ওই বিভীষিকায় তাকে হবেই যেতে, তবু অন্তত এই মুহুর্তে সে আটকে গেছে খুকাদা’য়, খোকন দর্জি’তে। খুকাদা মানেই রেল লাইন। আবহে, চালচিত্রে – রেললাইন। রেললাইনের কাটাকুটি। কাটাকুটি খুকাদা’র ললাটে, কপালে, গালে, চোখে, চোখের উপরের চশমা-কাঁচে।
তখনো সেখানে মালগাড়িগুলি ঝিমাতো। একটি লাইনের শরীরে জড়িয়ে আরেকটি লাইন, আরেকটি থেকে আরো একটি –  নির্মাণ করেছে আশ্চর্য ব্যূহ। ব্যূহ ঘিরে রেল দপ্তরের মালগুদাম । ছিল অদ্ভুত এক দমবন্ধ ঘ্রাণ সমস্ত অঞ্চলটিকে ঘিরে। রাধা-দুর্গা এই দুটি সিনেমা হলের  সঙ্গমস্থলে যে পীচরাস্তা, তার দুইধারে মাড়োয়ারিদের দোকান তথা বাস-অট্টালিকা-ভিড়ের কিনার ধরে চলেগেছে গলী – ক্রশিং-হীন লাইন পারহয়ে – আরেক বড় সড়কে। সেই মোহানায় ‘বিপিন পাল স্কুল’। এই রাস্তা সেখানে মিশে বেঁচে যায় হাঁপ ছেড়ে।
সেদিন পূর্ণিমা ছিলনা। তবে পূর্ণিমার ঘ্রাণ ছিল বলে একটা চাঁদ – আশরীর রক্তছোপ নিয়ে উঠে এসেছিল আকাশে। কারেন্ট ছিলনা। টানা কয়েকদিনের বৃষ্টিহীন চালচিত্রে গুমোট ছিল ভিতরে-বাহিরে। যদিও ‘তেলচুরা’কে পাখি বলবার মতই, একে শহর বলাহয়, তথাপি, সেদিন ইলেকট্রিক তার আর লাইনের কিনারে কিনারে ছুটেচলা না-ইলেকট্রিক তারদের কাটাকুটির ঘষাকাঁচে আকাশ হয়েছিল অদম্য নাগরিক। অন্তহীন বিষণ্ণ।
 সে’ই সুকুমারের প্রথম দেখা খুকাদা’র সঙ্গে। ‘খুকাদা’র চর্মচক্ষু যদিও তখন আর ফারাক করতে পারেনা অনেককিছুরই তবু জীবিকা হিসেবে বেছে নিয়েছে দর্জিত্ব। অথবা, যেহেতু এ’ই ছিল তার বাপ-ঠাকুর্দার পেশা, তাতেই ফিরেছিল খুকাদা। নিয়েছে বাসা শহরের ধূসরতম এই ভূগোলে। এ’ই ছিল তার পৈত্রিক বাসস্থান। সেখানেই ফিরেছে খুকাদা। ফিরেছে? কোথা থেকে? ফিরেছে যুদ্ধমাঠ থেকে। কোন যুদ্ধমাঠ? কেন ওই যুদ্ধে গিয়েছিল খুকাদা? – যাওয়ার, যুদ্ধে শামিল হওয়ার হেতু, যুক্তি– সাতাশ বছরের সুকুমারের কাছে যতোটা পরিষ্কার – ততোটা কখনো ছিল কি খুকাদার? সম্ভব ছিল কি থাকা? যদি গিয়েই ছিল যুদ্ধে, তো ফিরেই এলো কেন? ফিরে যে এলো, এই ফিরে আসা বিজয়ীর, বিজিতের না পলাতকের? ব্যাখ্যা করা কঠিন। এই মুহুর্তে আরো আরো কঠিন। ঠিক যেমন কঠিন, ব্যাখ্যা করা      “ কমরেড কানু সান্যালকে জেল ভেঙ্গে ছিনিয়ে আনুন” শ্লোগানের অর্থ। এতাবৎ। এতাবৎ এটুকু স্পষ্ট, যে, বাক্যটিতে “আপনারাই” শব্দটি উহ্য আর উহ্য বলেই বেশী উপস্থিত।
এসেছিলেন একজন এক্স-যোদ্ধা। সহযোদ্ধা, একদা, খুকাদা’র। এসেছিলেন ভিন শহর থেকে। ভিন শহর, কেননা, এই শহরের থেকে তিনি চলে গিয়েছিলেন, যুদ্ধের কোনো এক স্তরে। ভিন শহরে গিয়ে গাঢাকা দিয়েছিলেন। সে অনেকদিনের কথা। সুকুমার-বুদ্ধদের তখন এগারো ক্লাস। সেই প্রাক্তন যোদ্ধা এলেন স্বদেশে। স্ব-মফস্বলে । এসে তাঁর খোয়াইশ জাগল এক্স-কমরেডকে দর্শনের। সেই প্রাক্তন যোদ্ধার পিছু পিছু সুকুমার, বুদ্ধ আর সমর বিজয়ও গিয়ে হাজির হয়েছিল খুকাদা’র আস্তানায়।
মালগাড়ি শান্টিং করার ওই অঞ্চল, যেহেতু বসতিহীন ‘বস্তি’ এবং ছিল লোডশেডিং, সন্ধ্যা থেকেই, তাই মনে হচ্ছিল যেন অনেক রাত। অতঃপর খুকাদা আর তার পরিবারের মুখামুখি দাঁড়ানোমাত্র প্রকৃত মাঝরাত, নিশিডাকা মধ্যরাত ঘিরে ধরেছিল, অন্তত সর্বকনিষ্ঠ এই তিনজনকে। কিছুক্ষণ থেকে, বাকিদের ছেড়ে এই তিনজন চলে এসেছিল। ফিরতি পথে কথা ছিলনা কারোর মুখেই। ছিলনা কারন তাদের ঘিরে, তাদের সঙ্গে সঙ্গে আসছিল হাই পাওয়ার চশমার আড়ালে খুকাদার দৃষ্টি, তার একচালা গার্হস্থ, তার দশকেলাশপাঠরতা কন্যাটির অন্তরে-বাহিরে কৈশোর ছাড়িয়ে যৌবনে উড়ান দেওয়ার সমস্ত লক্ষণ । তিনজনের কেউই বলছিল না কোনো কথা।  চলতে চলতে, হঠাৎই বসে পড়েছিল সমরবিজয়। রেল লাইনেই। দেখাদেখি বসে পড়লো সুকুমার আর বুদ্ধ’ও। সমর বিজয় চোখ বন্ধ করে গেয়ে উঠেছিলঃ
 “ সারাদিন শুধু বাহিরে     ঘুরে ঘুরে কারে চাহি রে, সন্ধ্যাবেলার আরতি    হয় নি আমার শেখা”।
খুকাদা’র সঙ্গে প্রথম সাক্ষাতের ওই ছবিগুলিই আবার আসছে ভেসে। কিছু মাস আগে খুকাদা’র মৃত্যু খবর, যা’ও রহস্যে মোড়া, পেয়েও ওই সন্ধাটিতেই উড়ে গিয়েছিল মন। আজো যাচ্ছে। কিন্তু আজকের যাত্রায়, মন-ডানার বর্শার মতো করে সূঁচ ছুঁড়ে দেওয়ার অনুভব। বুদ্ধ তার চিঠিতে যে ইঙ্গিত দিয়েছে, না দিলেও, ওই একই ইঙ্গিত হয়তো সুকুমার দিতো বুদ্ধকে, সতীশ দেবের আজব-মরা’র খবরটি পেলে। নিশ্চিত একই কথা ভাবতো সমরবিজয়ও। কিন্তু সমরবিজয় কোথায়? কেন এক সময় তাদের থেকে নিজেকে সড়িয়ে নিলো সমরবিজয়?
ভাবতে, এই মুহুর্তে, আর ইচ্ছা করেনা সুকুমারের। সমরবিজয়ের গাওয়া গানটি বেসুরে গেয়ে সে ফিরতে চায় ওই অনেক আগের সন্ধ্যাটিতে। “ সারাদিন শুধু বাহিরে ঘুরে ঘুরে কারে চাহি রে, সন্ধ্যাবেলার আরতি হয় নি আমার শেখা। নিভৃত প্রাণের দেবতা যেখানে জাগেন একা …”। – সুকুমার গায়।
রাত যায়। রাত্রি উড়ে যায়।