Saturday, November 30, 2024

৪। নটীখাল বহিছে মন্থরে

 ৪। নটীখাল বহিছে মন্থরে



সুকুমারের মনে পড়লো মুখ, বাদল ভটের মৃত, পুঁটি-বাবু-ঘোষিত, “ইন্টারন্যাশন্যাল” কন্যাটির। 

তাঁবুর মতো খাটানো এই ধাবা। দশ দিক খোলা। ফলে টাটাবাবার ইস্পাত-গলানো-হাওয়া এখানেও ঢুকেপড়ে। তোলপাড় তোলে। উড়িয়ে নিয়ে যায় শালপাতা। উল্টে দিয়ে যায় হিসাব খাতা। দুলিয়ে দিয়ে যায় শো-পাঁচশো পাওয়ারের বাল্ব গুলি যাদের চোখ জ্বলে, বড় রাস্তার ইলেকট্রিক লাইন থেকে “হুক” মেরে আনা বিদ্যুতে। এখানের ভাষায় “কাটিয়াবাজি”। ধাবার যে মুখ হাইওয়ের দিকে, সেদিকে থেমে থাকে লরীর, ট্রাকের দল। চালক-দল নামে ধাবায়। রোটি-তড়কা খায়, রোটি-মুর্গা খায়, রোটি-শব্জি খায়, দারু খায়, চাবলও খায়। খেতে খেতে অনেকেরই চোখ চলে যায় সরু-রাস্তা বা সদর রাস্তার অনশকারে। সেখানে, অন্ধকারের সঙ্গে মিশে থাকা রোড-রেন্ডি দের খুঁজে নেয় দৃষ্টি। অপর পক্ষের দৃষ্টিও চিনে নেয়, কারা ডাকবে, কারা আসবে। আর সকল কিছুর গন্ধ ছাপিয়ে ম’ম’ করে রসুন-গন্ধ। শো-পাঁচশো পাওয়ার বাল্বদের কিনারেই ঝোলে তিনিটি-চারটি রেডিও। এক রেডিওর আওয়াজে বেড় দেওয়া যায়না গোটা চত্বর। সব রেডিওতেই বাজে একই স্টেশন। বাজে দিন রাত। যেমন এই মুহুর্তে, এই তিন চারজন মিলিয়ে প্রথমে ঘোষণা দিলোঃ “ফরমাইশ হ্যায় আপ কিঃ রাম পুর সে চিরাগ,রুস্তম, সাবিনা। রানীগঞ্জ সে পুলক, মিঠু, চিত্রা। আসাম সে …”। এইবার এরা, একত্রে, গেয়ে ওঠেঃ “ য়ে দিল্‌, হ্যায় মুশকিল জী’না ইঁয়াহা, জরা হটকে, জরা বাঁচকে, ইয়ে হ্যা বোম্বে মেরী জান”। সুকুমারের কিনারে, কাঠ বেঞ্চিতে এসে বসে দুই সর্দারজী ড্রাইভার। একজনের, যে বয়সে, স্পষ্ট ভাবেই বড়, দৃষ্টি উড়ে যায় রোড-রেন্ডি’র খোঁজে। “থালি” অর্ডার করা হয়ে গিয়েছে সুকুমারের। এবার সে একটি সিগারেট জ্বালায়। “থালি”র, শালপাতার থালায়, আসতে দেরী আছে। অন্তত পনেরো মিনিট তো বটেই। অন্য দিন হলে সে উদাস-ভান করে ঠিক লক্ষ্য করতো ওই দুই ট্রাক চালককে। টুকে নিতে তাদের নানান ডিটেল, মনে মনে। কিন্তু আজ আরকে জৈন, বাদল ভটের মড়া মেয়ে’র মুখ আর বাবলু বিশ্বাসের মাতাল কন্ঠে “ভেঙ্গে গেছে। দেওয়াল ভেঙ্গে গেছে। শালা’রা শেষ। শালারা পুরাপুরি শেষ, ইন্টারনেশনেলি ডুম্‌ড ” – সুকুমারকে ঘিরে আছে। ঠিক যেমন তখনো, তার চিল-ছাত-কোঠার বন্ধ দরজার ওই পাড়ে, ইস্পাত গলানো টাটাবাবা-হাওয়ায় উল্টেপাল্টে যাচ্ছে ওই খামটি, যা’তে রয়েছে সংবাদ – পাহাড়িয়া শহর খারলং’এর খারনাই লেকের জলে, খারলং পাব্লিক হেলথের বড় সাহেব সতীশ দেবের লাশ ভেসে উঠবার। 

সেই খামের প্রেরকজন, সেই সংবাদের পরিবেশক-জন – তখন হাঁটছে। মফস্বলের রাস্তা ধরে হেঁটে চলেছ্রে ঘরমুখো। নিত্যদিনই এই সময় তার এই ফেরা। এই রাস্তাচলা। রাত তখনো দশটার কাঁটা না ছুঁলেও স্টেশন শুনশান আর ঐ শুনশানের ভিতরে, ইস্টিশান-সিঁড়ির নিচে, গাছতলায়, অন্তত দুইজন রিক্সা চালক হাজির। নিত্যই। কিন্তু তারা এই মানুষটির দিকে তাকায় না। এই ছোকরা, এরা সকলেই জানে, হেঁটেই যায়। আস্তেধীরে, হেলেদুলে, হেঁটে যায়। সেদিনও এমনি, একটি চারমিনার সহ আস্তেধীরেই হাঁটা ধরেছিল বুদ্ধ। ভাবছিল সুকুমারকে পাঠানো চিঠিটার কথাই। পৌঁছলো কি? পৌঁছলে নিশ্চয় ফোন করবে সুকুমার। কিন্তু আজ সারাদিনও কোন ফোন আসেনি অফিসে। ফোন করেছিল বুদ্ধ নিজেও। দুইবার। একবার সুকুমারের অফিসে। অফিস টাইমে। আরেকবার, ফেরা-টাইমে, রাতে, সুকুমারের বাড়ি-মালিকের ফোনে। না পেয়ে নাম বলেছিল নিজের। বলেছিল সুকুমারকে জানাতে। বলতে, ফোন করতে। কেজানে, হয়তো কেউ-ই জানায়ই নি সুকুমারকে। 

আনমনে ঘড়ি দেখলো বুদ্ধ। রাত দশটা পেরিয়ে গেছে। মফস্বল শহর ঘুমিয়ে পরেছে ন’টা বাজতেই। রাস্তার কিনারের চল্লিশ পাওয়ারের বাল্বগুলিরো অনেকে ঘুমে। শিবুদার সাইকেল আর সাইকেল রিক্সা রিপেয়ারিং এর দোকানও বন্ধ। বুদ্ধ তবু দাঁড়িয়ে গেলো বন্ধ ওই দোকানের বারান্দায়। অপেক্ষা জেঠু কখন বেরোবেন আড্ডা সেড়ে। মোড় পেরিয়েই ‘মহানায়ক’ পত্রিকার অফিস। ওখানে বসে আড্ডা, শহরের ‘বড়’দের। এই আড্ডাকে বলা হয় ‘রাষ্ট্রসংঘ’। আড্ডা সেড়ে হেঁটে হেঁটে বাড়ি ফেরেন  জেঠু। এই রকম সময়েই। ওই  সময়টা  তাঁর সঙ্গ ধরার চেষ্টা করে বুদ্ধ। কিন্তু আজ কি খুব বেশি দেরী হয়ে গেলো যে “রাষ্ট্রসঙ্ঘ”ও গেছে বন্ধ হয়ে? সামান্য উঁকি দিয়ে দেখবার চেষ্টা নেয় বুদ্ধ। নাহ, আলো জ্বলছে তখনো। দেখা যাক আরো মিনিট দশ। আরেকটা সিগারেট জ্বেলে নেয় বুদ্ধ। তার চাকরি নীলাম বাজারে। সুকুমারের মতে “যে বাজার হইতে কোহিনূর হীরা খরিদ করা হইয়াছিল”। চাকরীসূত্রে সেখানে একটি বাসস্থানও প্রাপ্য বুদ্ধ’র। কিন্তু মন টেঁকেনা। করিমগঞ্জ থেকেই সে করে যাতায়াত। “ডেইলী প্যাসেঞ্জারী”। জেঠু  রিটায়ার করেননি এখনো।  ফলে দিনে তাঁকে পাওয়া যায়না প্রায়। ছুটির দিনে গেলেও একা পাওয়া মুশকিল। কেউ না কেউ থাকেই তাঁর কাছে। ফলে রাতের ঐ নিঝ্‌ঝুম সময়টুকুর অধিকার বুদ্ধ ছাড়তে চায়না সচরাচর।

রাষ্ট্রসংঘ’ আড্ডা সদ্য শেষ। বোঝা যায়। কারন যে  মানুষটিকে দেখাযায় স্কুটারে চাপতে, তাঁর পরে আর একজনই থাকে বাকি। জেঠু। ।  পানুবাবুর স্কুটার স্টার্ট নিতে নিতেই দেখা যায়  পাজামা-পাঞ্জাবী পরিহিত, একজন লম্বা মানুষ, মুখে জ্বলন্ত সিগারেট নিয়ে বার হয়ে এলো রাষ্ট্রসংঘ থেকে। হাঁটতে হাঁটতে এগিয়ে এলো মিশন রোডের মোড়ের দিকে। ওই মানুষ – জেঠু। ঐ জ্বলন্ত সিগারেট– চারমিনার। বুদ্ধ তার প্রায় সদ্য জ্বালানো চারমিনারটা পায়ে পিষে নিভিয়ে দিয়ে এগিয়ে যায় তাঁর দিকে। ডাক দেয় ‘জেঠু’ ।

জেঠু থামেন। বলেনঃ ‘ও, তুই আইস্‌স – চল্‌’।

শুরু হয় পথচলা। কথায় কথায়। 

কথা। কতো কথা। আজ। অন্য দিন। সব দিন। 

কি কথা এতো সদ্য যৌবন ছোঁয়া এক যুবক আর ষাটের কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়া এই মানুষটির?

কথা। তবে কাজের নয়। অ-কাজের।

-কাজের? কাজ আর অ-কাজের, -কাজ আর কু কাজের সংজ্ঞা গুলি, দূরত্ব, ভেদরেখাগুলি স্পষ্ট নয় বুদ্ধর কাছেও। তবে সুকুমার বা সমরবিজয় দিগের মতো সব সংজ্ঞার মুখামুখি দাঁড়িয়ে, বাইরে, চ্যালেঞ্জ করেনা বুদ্ধ। সে ভাবে। ভাবে, যেমন এই মুহুর্তে, মাণিক বন্দ্যোপাধ্যায়, তারাশংকর, বিভূতিভূষণ, ফ্রেজারের ‘গোল্ডেন বাউ’, মানবেন্দ্র নাথ রায় থেকে মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধায়, শিবনাথ শাস্ত্রি’র শিশুদের জন্য রচনা থেকে প্রেমেন মিত্তির, লীলা মজুমদার হয়ে সত্যজিৎ রায় অথবা  ‘বোমার ভয়ে বার্মা ত্যাগ’হেন না শোনা নাম, না-জানা কাহিনী – এ সকল যদি অ-কাজের হয়, তবে “কাজ” ঠিক কোন জিনিস? জেঠু যদিও ইতিহাসের পন্ডিত, ইতিহাস কেন্দ্রীক লেখালেখি ও গবেষণার জন্যই তাঁর মূল খ্যাতি তথাপি তিনি প্রকৃত প্রস্তাবে সাহিত্যেরি মানুষ। সিগারেট ও তাঁর নিজের সম্পর্ক নিয়ে লেখা গদ্যটি বুদ্ধ ফোনে পড়ে শুনিয়েছিল সুকুমারকে। সুকুমার পরে, শোনায় সময়বিজয়কে।

শুরু হয় পথচলা। কথায় কথায়। হাঁটতে হাঁটতে। সতীশ দেবের লাশ প্রসঙ্গ আর তার সঙ্গে খোকাদা’র রহস্যময় মৃত্যুর মধ্যে যে যোগটির কথা ভেবেই শিউরে উঠেছিল বুদ্ধ, তুলি-তুলি করেও ওই কথাটা তোলেনা বুদ্ধ। কেন কে জানে। তার চিঠি পেয়ে সুকুমারও কি শিউরে উঠবে? ভাববে একই কথা

কথায় কথায়, হাঁটতে হাঁটতে – আসছে, চলে যাচ্ছে বনমালী রোডে যাওয়ার বাঁশের সাঁকো, রেশন-দোকানের মুখোমুখি বাঁশঝাড়, থানা-টিলা, নীচের যমজ বট। তারপর বাঁদিকে পর পর দুটো গলী। মধ্যে পুকুর। দ্বিতীয় গলীটি গিয়ে মিলেছে নটী খালের সমান্তরাল লঙ্গাইরোড গামী রাস্তায়। ঐ গলীরি প্রান্তে ‘দুলাল কুঠি’। জেঠুদের বাসা। তরজা-বেড়ায় ঘেরা। বাঁশের গেট। ওই গেটের সামনে দাঁড়িয়ে আরো কিছুক্ষন গল্প-গাছা। তারপরে জেঠু ঢুকে যান গেট ঠেলে।

 বুদ্ধ আবার  সিগারেট ধরায়। হাঁটে। মর্মে সুকুমারকে পাঠানো চিঠিটার কথাও হাঁটে। আর এই হাঁটার পাশে পাশে, ‘Quiet Flows The Don’? নাহ।   

নটীখাল বহিছে মন্থরে।