৫। নটী-কথা
নটীখাল বহিছে মন্থরে।
শোনা যায়,কান-মধু গ্রামের জমিদার, দূর দেশ থেকে আনাচ্ছিলেন এক নর্তকীকে । তাঁর নতুন নাচঘর উদ্বোধন করবার জন্য। বুদ্ধ ভাবে, সেই আমলে এই অঞ্চলে ‘নাচঘর’, নির্ঘাৎ জমিদারটি দেখে এসেছে ঢাকা-কইলকাত্তা গিয়ে। এই তল্লাটেও জমিদারগণ কেচ্ছা কেলেঙ্গকারি, চোটপাট সহ থাকলেও নাচঘরের নিদর্শন নেই। সম্ভবত এই সকল চিরস্থায়ী বন্দ্যোবস্তের পরের আমল, যখন দেশগ্রাম ছেড়ে জমিদারদের শহুরে হওয়া এবং অন্তিমে উচ্ছনে যাওয়ার হিড়িক।
গল্প-মতে তখন বর্ষার সময়। কথক মামুদালির ভাষায়, ‘জলের দিন’। নর্তকীর নৌকা আসছিল ‘বড় নদী’ দিয়ে। বড় নদী মানে, খুশিয়ারা হয়ে। সপ্তাহ-দুই ভেসে ভেসে নোকা যখন ভিড়লো ঘাটে, তখন নর্তকী নারাজ মাটিতে পা রাখতে। জলে ভাসতে ভাসতে তখন তার জলের নেশা গিয়েছে ধরে।
“হয় নাচঘর অব্দি নৌকায় যাবো নয়তো ফিরে যাবো”। বায়না সুন্দরীর।
এদিকে পাঁজি দেখে, পুঁথি দেখে দিনক্ষণ ঠিক হয়ে আছে নাচঘর উদ্বোধনের। বাবু পড়েছেন ফাঁপরে। কি যায় করা? নৌকায় উঠে হাতে ধরছেন সুন্দরীর, পায়ে পড়ছেন সুন্দরীর। তোফা দিচ্ছেন। মোহর দিচ্ছেন। লিখে দিতে যাচ্ছেন ঘর গেরস্থির কাগজ। কিন্তু সুন্দরী নারাজ। তার এক কথাঃ “হয় নাচঘর অব্দি নৌকায় যাবো নয়তো ফিরে যাবো”।
এই গল্প এখনো বলেন মামুদালি। এখন বৃদ্ধ মামুদালি। বুদ্ধ-সুকুমার’দের শুনিয়েছেন, এই গল্পই, এক দশক আগে, অন্তত ডজন বার। প্রতিবারই গল্পে লেগেছে নতুন নতুন রঙ। হানা দিয়েছে নতুন চরিত্র। অনেকযুগ যাওয়া হয়না – না “সেটেলমেন্ট বাজার”, না’তো মামুদালি’র চা-বিস্কুট-ঘুঘনীর দোকানে।
বাবু জমিদারটি যখন নিরুপায় হয়ে প্রায় ঝাঁপ দেন খুশিয়ারার জলে তখনই এক জোয়ান মদ্দ এসে হাজির। সে বল্লো “উপায় করে দিতে পারি। কিন্তু শর্ত আছে”।
“বাবা, মাথা খাও, যা ইচ্ছে তা’ই নাও। বলো কি উপায়?”
“রাতারাতি খাল কেটে নৌকা নিয়ে যাবো আপনার নাচঘরে।”
“পারবে?”
“নিচ্চয় পারবো। না পারলে কান কাটবেন। তবে –“
“তবে আপনার নটীর সঙ্গে এক রাত ...।”
বাবুটির বুক ফাটলো। তবু বল্লেন “ কিন্তু, মানে,ও রাজি না হলে... মানে, খুব জিদ্দি মেয়েলোক কি’না। দেখতেই ত পাচ্ছ...”
“হক্ কথা। আমিও জোর কিছু করবো না। “না” বল্লে না-ই সই। ” আর কিছু না বলে সোজা উঠে গেলো নর্তকীর নাও’ এ। তার হাবভাব দেখে কেউ সাহস করলোনা আটকানোর।
এই বীর, মামুদালির গল্পে, মুসলমান আবার একই কিচ্ছায়, সন্তর বাজারের হরি পালের মুখে, ওই বীর-জন “হাট্টা-গাট্টা, পইতা পড়া বাবন। ব্রাহ্মণ ছাড়া এমন দম আর কার হইব?” – কিন্তু কথক হরি পাল তো নয় ব্রাহ্মণ। “এখানেই গ্রামসী’র হেজিমনি’র কথাটা বুঝতে হবে।” জেঠু বলেছিলেন। দিয়েছিলেন বুঝিয়েও।
মুসলমান হোক আর বাবনই হোক, ওই “বীর” উঠে গেলো নর্তকীর নৌকায়। তার দেখা হলো নর্তকীর সঙ্গে। কিন্তু কথা কি’যে হলো, কি’যে ঘটলো অন্দরে – জানলোনা কেউ। বার হলে এলো মানুষটি। চলে গেলো। ফিরে এলো একটু পরেই। ঘন্টার মধ্যে। সঙ্গে হাজার লোক নিয়ে ফিরে এলো। “পাহাড়ি কুলি এরা। ইখানর মাইনষে চিনইন না তারারে”। ফুটনোট মামুদালি’র। ওই হাজার হাত লেগে পড়লো খাল কাটার কাজে। পরদিন ভোরের মধ্যে খাল, জলের নূপুর বাজিয়ে দিয়ে, নাচতে নাচতে হাজির হলো বাবুর নাচঘরে। সারারাত জেগে জেগে পরিশ্রান্ত বাবু যেন নতুন জওয়ানী পেয়ে উঠে এলেন। দৌড়ে গেলেন নৌকার অন্দরে।
“কি গো সুন্দরী, কই গো সুন্দরী...”
সাড়া নেই।
কোথায় সুন্দরী?
দেখাগেলো দাসীগুলি ঘুমে অচেতন।
সুন্দরীর খাঁচা ফাঁকা। পক্ষী নেই। নেই খাল কাটার দায় মাথায় নেওয়া জোয়ান-মদ্দটিও।
তারপর, কোনো গল্পে, মামুদালিরই কোনো কোনো ভার্সনে, জমিদারবাবুটি দিল গলায় ফাঁস, মতান্তরে, সব ছেড়ে বার হয়ে গেলো সন্ন্যাসী হয়ে।
“তাহলে তো ওই লোকটা চোর। অন্যের মেয়েমানুষ নিয়ে পালালো”। – এই যুক্তি তুলেছে সুকুমার, মামুদালির কাছে, তুলেছে হরি পালের কাছে। মোদ্দা, সে দেখতে চায়, ওই “বীর” যদি “চোর” হয় তাহলে একে নিজ নিজ জাতের উল্কি দিয়ে, নিজ নিজ জাত’কে উচ্চাসন দেন কিনা কথকেরা। আর কথকেরা, উভয়েই, ঐ প্রশ্নের মুখামুখি এসে, দিয়েছেন একই উত্তর “আরে নাহ্, অই বেটা জমিদার মানুষ ভালা আসিল না। আগেও অনেক বেটি রে আনাইয়া গুম-খুন করাইসে”। – তবে কেউ-ই, কখনোই, ওই তথ্যটি নিজে থেকে আনেননা গল্পে।
নটী গেলো। বাবুও গেলেন। কিন্তু রয়ে গেলো এই খাল। নটী খাল।
সেই নটীখালই, আজো, বহিছে মন্থরে। তার কিনারের গঞ্জ-গ্রামের সরল-মন্থরতা তার চলাতেও।
মন্থর? হয়তো ঠিক। কিন্তু সরল? অদ্যাপি? মানতে পারেনা বুদ্ধ। সতীশ দেবের লাশ প্রসঙ্গ আর তার সঙ্গে খোকাদা’র রহস্যময় মৃত্যুর মধ্যে যে যোগটির কথা, কিছু সময়ের নিমিত্ত, চলে গিয়েছিল মন, মগজের পিছন বেঞ্চিতে, তা’ই আবার দখল নেয় ফার্স্ট বেঞ্চের। বেঞ্চিতে, এর কিনারেই, কেন যে এসে বসে, বসছে বারবারই, একটি শীতের রাত,
একজন মাতালের ঘোষণা “ভেঙ্গে গেছে। দেওয়াল ভেঙ্গে গেছে। শালা’রা শেষ। শালারা পুরাপুরি শেষ, ইন্টারনেশনেলি ডুম্ড ”...।