২। খারলং
ধোঁয়া —- সিগারেটের, চা'য়ের, চা যেখানে তৈয়ার হচ্ছে, সেই চুলার —- সব মিশে যাচ্ছে, অথবা পরিণত হচ্ছে, কুয়াশায়। এখানে, এখনো মাঝে মাঝেই, একেকটা দিন এরকমই যায়। সকাল ঘন কুয়াশা মুড়ি দিয়ে এসে, আস্তেধীরে, দুপুর কিংবা দুপুরও পার করে, কোনোদিন উদাম হয়। ঢুকতে দেয় সূর্য্যালোক। কোনদিন দেয়ই না। চাদর গায়েই বিকাল মিশে যায় রাত্রিতে। “আউর এক কাপ দিজিয়ে” বলা খদ্দেরের হাতে দ্বিতীয় কাপ চা দিতে দিতে থাওসেনবুড়া, তার নিজ ভাষাকে হিন্দির নিকটতম করে যা বলে, তার অর্থ হয়, যে, তার অভিজ্ঞতা বলছে, আজকের কুয়াশা দুপুর নাগাদ কেটে যাওয়া উচিত। বলে, তুমি তো বেড়াতে এসেছ। নতুন মানুষ। তুমি জানোনা। এরকম কুয়াশা-দিন, বেশি আগের কথা না, আমার বিয়ের পরেও, মাসে, যে কোনো মাসে, যে কোনো ঋতুতেই প্রায়, দশটা-পনেরোটা, ইয়ে, কম করেও সাত-আট-টা আসতো। এখন যত্তো গাছ-গাছালি কমছে, যত্তো বাড়ি-গাড়ি বাড়ছে, কুয়াশার দেবী ততো রেগে উঠছেন। সড়ে যাচ্ছেন দূরে। আমাদের শহর তো তবু এখনো দেবীর অনেক কাছে, এখনো, শুধু ঘোর শীতে হলেও, দুই-চারদিন বরফের মুখ দেখা যায়। কিনারের পাড়ারগুলো দেখো। শিলং বলো, হাফলং বলো, কুয়াশাও আমাদের চেয়ে কম। আর বরফ? —- ভুলেই যাও।
তোড়ে হয়তো আরো অনেক কথা বলে যেতো বুড়া থাওসেন, কিন্তু অন্দর থেকে, তাদের ভাষায়, নাতনী তাড়া লাগায় কোনো কাজের জন্য। “আসছি রে বোন আসছি” বলতে বলতে যায় বুড়া। মিনিট দশ। আবার আসে। আরো দুইজন খদ্দের এসেছে চায়ের। মাথা নেড়ে চলে যায় দোকানঘরের অন্দরে। ফিরে আসে দুই কাপ চা নিয়ে। চায়ের কাপ হাতে হাতে দিয়ে, যেন মাঝখানে কিছুই বাদ যায়নি, যেন এরাও হাজির ছিল তার বকবকানির প্রথম সর্গে, সেরকম করেই, যদিও এই দুই খদ্দের তার নিজের ভাষারই, তবু, তার নিজ ভাষাকে হিন্দির নিকটতম করে বলে যায়ঃ ওই যে বলছিলাম কুয়াশার দেবী রাগ করে দূরে সড়ে যাচ্ছেন, দেখছোনা, তার ফলও যে ফলছে হাতেহাতে। কথানাই বার্তানাই বাঙ্গালী অফিসারবাবুর লাশ সেদিন সকালে ভেসে উঠলো লেকের জলে। তুমি তো বেড়াতে এসেছো। তুমি হয়তো জানো না। এরা জানে। হ্যাঁ, মানি, বাবুটা নেশাভাং করতো। হয়তো নেশার ঘোরেই পরে গেছে জলে, সাঁতরাতে পারেনি, কিন্তু এখন কেন? এত বচ্ছর পরে কেন? এই বাঙ্গালী বাবু তো এখানে আছে প্রায় এক কুড়ি কাল। এক কুড়ি কাল আছে, কিন্তু কুয়াশার দেবী তো তখন মানুষজনের উপর খেপে ছিল না। তাই কিছু হয়নি। কারোরই হয়নি। এখন কুয়াশার দেবী রেগে যাচ্ছে। দেখবে, এখন আরো কত কি ঘটে। দেখেনিও, কুয়াশার দেবী প্রতিশোধ নেবে। নেবেই। এতো এতো গাছ, পাহাড়, টিলা গায়েব করবার বদলা নেবেনা? এই সব গাছ, পাহাড়, টিলা, পাখি, জন্তু —- এদের মালিক কে? তুমি? আমি? সরকার? না। কেউ না। এই সব কিছুর মালিক দেবী।
আবার আওয়াজ আসে অন্দর থেকে। বুড়ার নাতনি ডাকে। বুড়া যায় দোকানের অন্দরে। অন্দর আর দোকান-অন্দর অবশ্য এক নয়। দোকান, বুড়া থাওসেনের, আরো অনেকেরই, কাঠের পাটাতনের উপর, কাঠের শরীর আর টিনের চাল নিয়ে, কাঠের খুঁটিতে ভর দিয়ে, টিলার গায়ে দাঁড়ানো। থাওসেন বুড়ার দোকানে পাটাতন কাঠের, খুঁটি কাঠের, চাল টিনের, তবে দোকান-শরীর বাঁশের বেড়া। এমন আরোও আছে। –--এটি দোকানের বাইর। দোকানের অন্দর সাধারণত হয় সেই দিকটি, যে দিক ঠেকে আছে টিলাতে। সেদিকে থাকে দরজা। কাঠের মই, সিঁড়ির মতো করে নেমে গিয়ে মিশেছে টিলায়। সেখানে কোমর অব্দি সিমেন্ট আর বাকিটা বাঁশের অথবা বাঁশের উপর সিমেন্ট বা মাটির পলেস্তারা। চাল টিনের। —- আদত অন্দর। অন্দরমহল।
শহরটি ছোটো। তবে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে টুরিস্ট-স্পট প্রতিযোগিতায়। ফলে ভিড় থাকে সারা বছরই। আর ভিড় থাকার সুবিধা এই, যে, ভিড়ে মিশে অদৃশ্য হয়ে যাওয়া যায়। তাছাড়া এই যে ভিড়, বেড়াতে আসা লোকের, তাতে অদৃশ্য হয়ে থাকা, মিশে থাকা, ভিড়ের দেহে, নিবিড়তর ভাবে, হয় সম্ভব। ঠিক যেমন থাওসেন বুড়ার দোকানের ওই “ আউর এক কাপ দিজিয়ে” বলা খদ্দেরটি, থাওসেন বুড়ার বক্তৃতার দ্বিতীয় সর্গের শেষাশেষি উঠে মিশে গেলো কুয়াশায়, মিলিয়ে গেলো ভিড়ে। “তা, যা বলছিলাম, তোমরা তো জানোনা…” —- দ্বারা তার বক্তৃতার তৃতীয় সর্গ আরম্ভ করে টের পেলো ওই অনুপস্থিতি। টের পেলো এবং বিরক্তও হলো এই ভাবে মাঝ বক্তৃতায় উঠে চলে যাওয়ার জন্য। এ আসছে থাওসেন-বুড়ার দোকানে, আজ মিলিয়ে, থাওসেন দেখলো, তিন দিন। প্রথমদিনই, এ'কে বাঙ্গালী বলে জানামাত্র, ভেবেছিল বলবে। কিন্তু আজকাল অনেক জরুরি কথাই ভুলে যায় থাওসেন। ভুলে যাচ্ছে। ঠিক যেমন এই মুহুর্তে। বাঙ্গালী ওই খদ্দেরকে কিছু বলবার আছে, এটা মনে পড়লেও, কি'যে বলবার, সেটাই এখন উড়ে গেছে মুন্ডু থেকে। দেখাযাক, কাল সকালে যদি আবার দোকানে আসে আর যদি তারও তখন মনেপড়ে ঠিকঠাক —- বিড়বিড় করতে করতে এইবার নিজেই বেঞ্চিতে বসে পড়ে বুড়া। একটা সিগারেট জ্বালায়।
কাটিং রোড নামক রাস্তার লাগোয়া সিঁড়ি বেয়ে রিপার স্ট্রিট নামক রাস্তার দিকে নামতে নামতে, থাওসেন-বুড়ার “আউর এক কাপ দিজিয়ে” বলা খদ্দের-জনও পকেট থেকে বার করে আনে সিগারেট-প্যাকেট। এই শহরে এটা তার দ্বিতীয় বার আসা। প্রথমবারের আসা এবং যাওয়া সবই যেন ঘটেছিলো জ্বরের মধ্যে। ঘোরের মধ্যে। এইবারও একটা জ্বরভাব, বাস্তবিক সে টের পাচ্ছে সবসময়। কিন্তু ঘোরটা নেই। ফলতঃ এইবার সে রাস্তা-নাম গুলি লক্ষ্য করে এবং বলে, নিজেকেই, সাম্রাজ্যবাদ যদি জানতো যে তাকে ভোল পাল্টাতে হবে, তবে কি রাখতো এই রাস্তা-নাম গুলি? নাকি জানতো বলেই এই সকল নামের ছ্যাঁকা সে দিয়ে গেছে, তার দ্বারা দখলীকৃত প্রত্যেকটি দেশের গায়ে?