১। ইঞ্জিন
“ কি ইঞ্জিন সাহেব, মেজাজ ঠিক নেই মনে হচ্ছে?”
বয়স চল্লিশ পেরোনো, মাথায় চুল কমে এলেও যে টুকু আছে, সে টুকুকেই বাঁ দিকে ফিটফাট সিঁথি করে আঁচড়ানো, কুচকুচে কালো, লম্বা, সিড়িঙ্গে মার্কা যে মানুষ টি বাক্যটির বক্তা, সে, কুন্ডু। কুন্ডুদা। সে পেশায় “ফিটার”। এই শালা-জামাইবাবু কোম্পানির পুরনো মানুষ। তবে সুকুমারের “ইঞ্জিন” নামটি তার দেওয়া নয়। এটি দিয়েছে স্বপন। স্বপন, হয় “ক্রেইন অপারেটর”। বয়সের যে মাপ বছরের সংখ্যা দ্বারা হয় নির্নীত, তাতে স্বপন, সুকুমারের চেয়ে কয়েক বছরের বড় হলেও, পৃথিবী নিজে যেখানে পাঠশালা, তার ছাত্রত্বের, তাতে অর্জনের নিরিখে, সুকুমার টের পায়, তাদের ব্যবধান কয়েক জন্মের। স্বপন, সুকুমারের চেয়ে অন্তত কয়েক জন্মের বড়।
স্বপনই তার নাম দিয়েছে ইঞ্জিন। এখানে আসবার প্রথম কিংবা বড়জোর দ্বিতীয় দিনে।
“আপনাকে দেখে তো মোটেই লাইনের বলে মনে হচ্ছেনা”। বেশ নাটুকে সুরে আর ভঙ্গিতে বলেছিল স্বপন। এই অফিসকোঠাতেই। অফিস বলতে টাটাবাবার দুর্গ অভ্যন্তরে যে অস্থায়ী তিন কোঠার কাঠামো, যার আয়ু প্রোজেক্ট শেষ হলেই খতম, যে রকম অফিস খুলে বসে আছে আর সকল ছোটোবড়ো ‘কোম্পানি’রা, সেই রকমই একটি।
দুই মালিকের একজন, অমিতাভ রায়, অফিসকোঠা ছেড়ে বাইরে যাওয়ামাত্র অন্য অন্য বাবুরাও পিছনে পিছনে বার হয়ে গেলে, অফিস মুহুর্তে হাল্কা। তখুনি কথাটা বলেছিল স্বপন। শুনে অবশ্যই হকচকিয়ে যাচ্ছিল সুকুমার। দেখে তো মনেহয় লেবার ক্লাস। কিন্তু এমন ফড়ফড়িয়ে কথা, ফড়ফড়ানো কথা। হো হো হেসে বল্লো স্বপনঃ “ রেগে যাননি তো স্যার? অধমের নাম স্বপন। এখানে ক্রেন অপারেট করি। স্যার কি সাইট সুপারভাইজার হয়ে এলেন নাকি? সাহাবাবুর পাততা কাটলো নাকি তবে?”
“সাইট সুপারভাইজার”? মানে “ওভার সী-আর”? এসব তো, সুকুমার জানে, ডিপ্লোমা দের জন্য। যে ডিভিশনেই হোক আর যে ভাবেই হোক সুকুমার বি.ই পাশ দিয়েছে আর তাছাড়া এপয়েন্টমেন্ট লেটারেও লেখা আছে, সে ইঞ্জিনিয়ার। সুতরাং স্বপনের প্রশ্নের দিকে সে ছুঁড়ে দেয় ওই শব্দটিই। আবার হাসে স্বপন। “হুঁ, আমিও তা'ই বলেছিলাম কুন্ডুদা'কে, আপনাকে দেখামাত্র। ইঞ্জিনিয়ার। স্যারের কোন ডিগ্রি নেওয়া হলো?”
“বি.ই”। পলক থেকে “ আর.ই.সি, শিলচর”।
“আপনার প্রথম চাকরি?”
যদিও বাবার সৎভাইএর দৌলতে জুটেছে, তবু চাকরি তো বটে। প্রথম চাকরি। ঠিক।
“এদের আসলে ইঞ্জিনিয়ার দরকার নেই। এদের লাগে ইঞ্জিন”। আমার হোহো হাসিতে ফেটে পড়ে বেঁটেখাটো, সামান্য নধর-মতো হলেও পিটানো শরীর আর মোটা গোঁফের অধিকারী এই লোকটি। এইবার এগোয় কুন্ডুদা। “ স্বপনের ইয়ার্কিতে আপনার মুখ যা হয়েছিল, তা দেখেই প্রানে মোচড় দিলো”। পরে বলেছিল কুন্ডুদা।
“ এই স্বপন, তোর ইয়ার্কি থামাতো। স্যার, ব্যাপার হচ্ছে, মানে জেনে রাখাটা আপনার জন্যই, ভালো, ইয়ে, মানে, এরা, এখানে, মানে এই শালা-জামাইবাবু কোম্পানি, মানে, এই ক্যামকন কোম্পানি, এদের আসলে পাশ-করা ইঞ্জিনিয়ারের কোনো দরকারই নেই। দরকার আপনার সাটিফিকেট টা আর সই। স্বপন, মানে ওই কথাটাই…”
সুকুমার ইঞ্জিনিয়ার সেই থেকে এই তিনজনের নিভৃত আসরে “ইঞ্জিন”। এই তিনজনের নিভৃতি যতো সহজে হয়েছিল,তেমন আর হয়নি। এতাবৎ। সুকুমারের।
যদিও পণ্য কেন্দ্রীক ব্যবস্থায় চাষী, কৃষক ও আদতে মজুর, ক্ষেতমজুর, তথাপি যে অঞ্চলে সুকুমার-বুদ্ধ দের বেড়েওঠা, রাজনীতি তে হাতেখড়ি —- সেখানে ক্ষেতমজুর এখনো, সর্বাংশে সব-ছাড়া, সব-হারা নয়। অতএব প্রথম চাকরির মতো মজুর শ্রেণীর সঙ্গেও এই প্রথম সাক্ষাৎ সুকুমারের। কিন্তু স্বপন বা কুন্ডুদাও যে নয় সেই অর্থে সব-ছাড়া, সব-হারা আর তাদের অন্দরের ওই না-লেবার সত্তা, যা মূলত মধ্যবিত্ত, তারই জমিতেই যে এই ত্রয়ীর একাত্মতার বীজ, কথাটি তৎক্ষনাৎ কেন, স্পষ্ট হতে লেগেছে অনেকটা সময়। তবে স্পষ্ট হয়েছে অন্তিমে।
“ কি ইঞ্জিন সাহেব, মেজাজ ঠিক নেই মনে হচ্ছে?” —- বলে কুন্ডুদা। বলে “আজই দিনটা এমন বিশ্রী, এমন মেঘলা করে ফেল্লো”।
“তাতেই বোধহয় মুড খারাপ হয়ে গেছে আমাদের ইঞ্জিনের”।
“আরে নাহ। আমাদের ইঞ্জিন কবি মানুষ। মেঘলা দিনে কবিদের মেজাজ বিগড়ায় না। ইঞ্জিনের মন সত্যি সত্যি আজ ভাল না”।
ইশ, ভাগ্যে এরা ‘ইঞ্জিন’ বলে। ভাবে সুকুমার। যদি ‘স্যার, সাহেব’ করতো, তাহলে কি পারতো, তার বয়স, কাজে তার অনভিজ্ঞতা, তার একলা-একা থাকা-চেষ্টা —- সমস্ত মিলিয়ে তার, সুকুমারের প্রতি তাদের স্নেহ, ভালবাসা ঢেলে দিতে ডাকটিতে? স্বপন গোঁয়ারগোবিন্দ রকমের লোক। কাজ করে জান দিয়ে। মাল টানে পেট ভরে। হাসে হোহো করে। খুব সূক্ষ কিছু তার খুব একটা চোখে পড়েনা। কিন্তু কুন্ডুদা অন্য জিনিস।
প্রথম প্রথম, যদ্দিন সিং মহলের কোঠা গুলি যায়নি ভর্তি হয়ে, মানে সব বাবু'রা এসে হাজির হওয়ার আগে অব্দি, সিং মহলেরই এক কোঠায় ছিল কুন্ডুদা। পরে, বাবুরা এলে, দূরের থেকে আনা শস্তা লেবার-দল হাজির হলে, কুন্ডুদা কেও লেবার-বস্তিতে যাওয়ার হুকুম দিলো কোম্পানি। কোম্পানি বলতে এখানে পরমেশ সেনই বুঝতে হবে। “এতো খরচ দিয়ে নেওয়া অফিসার্স কোয়ার্টারে লেবার থাকতে দিলে চলে? আজ কুন্ডু একটা রুম নিয়ে বসে আছে, কাল স্বপন বলবে আমাকেও রুম দাও। এরপরে পুরো লেবার বস্তি উঠে আসবে অফিসার্স কোয়ার্টারে থাকতে। প্লাস, হোয়াট এবাউট আদার্স? আই মীন অন্য কোম্পানির লোকেরাই বা কি বলবে? প্রেস্টিজ মেটার হয়ে যাবে বস”। রেখেঢেকে নয়, সর্বসমক্ষেই, সাহাবাবুকে বলেছিল পরমেশ সেন। যেন ওই মুহুর্তে আশেপাশে আর কেউ, কুন্ডুদা, স্বপন, সুকুমার —- কেউ —- নেই।
সিং মহলে কোঠা খালি থাকার আমলেও স্বপন কিন্তু নিজের ব্যবস্থা করে নিয়েছিল পিছনের বস্তিতে। পরে, ত্রয়ীর মদের আসরে, বলেছিলঃ “বুঝলে ইঞ্জিন, না না, তোমার কথা আলাদা। তুমি অন্য রকম, তুমি আলাদা, তুমি আমার ছোটভাই”...।
স্বপনের শিবের গীত থামিয়ে দিয়েছিল কুন্ডুদাঃ “ সেসব ইঞ্জিন জানে। লাটক না করে আসল কথা কিছু থাকলে বল, নাহলে চুপ যা”।
“হ্যাঁ, আসল। আসল কথা এটাই।”
“কোনটা? ইঞ্জিন অন্য রকম? ইঞ্জিন আমাদের ছোটভাইয়ের মতন?”
“এটাও আসল কথা। ওইটাও আসল কথা”।
“ ওইটা আবার কোনটা?”
“আরে ওই যে বললাম, বারা, বাবুদের কাছ ঘেঁষতে আমার বমি পায়। আমি শালা ছোটলোক, আমার কিনারে, আমার সঙ্গেও আমি ছোটোলোকই দেখতে ভালবাসি। আমাকে তো বারা পয়সা দিলেও ওই বাবুবাড়িতে থাকতাম না। আবার বলে কিনা অফিচার-কুয়াটার। শালা এই কুন্ডুদার হয়েছে মুশকিল”।
“ মুশকিল? আমার? কিসের মুশকিল রে বারা?”
“আরে বারা, তুমি ওই মাঝখানের টা”। নিজের পুরুষাঙ্গের দিকে ইশারায় দেখায় স্বপন। “তুমি বারা না-ছোটলোক, না-ভদ্রলোক। তুমি শালা ওই বারার মতো। দুলছো। খালি দুলছো। ভদ্রলোকের ঠেলা খেয়ে এসে জোটো ছোটোলোক দের দলে। আবার পারোনা ছোটলোকের ছোটলোকামি সইতে। আমি বারা, স্বপন, বারা, জানো ইঞ্জিন, সেই হরিয়ানা থেকে এসেছি ট্রাকে চেপে। সেই দশ-চাক্কি, বারো-চাক্কি লরী। চারটা করে ক্রেইন, আরে, এই শালা জামাইবাবু কোম্পানির বিচি-ধোন ক্রেন নয় হে, ট্রিপল সাইজ। একেকটা ট্রাকে। রাস্তার খাওয়া, ঘুম, হাগামোতা, চোদা —- সব। আরেকবার সেই গুজরাটের দিকে…।”
“ স্বপনের মধ্যে লেবার-চরিত্র মধ্যবিত্ত চরিত্রকে ছাপিয়ে যায় হয়তো এই বেদুইন যাপনের নিমিত্তই। একফালি বাড়ি একটা আছে কোথাও। পৈতৃক। শিকল ছাড়া ওই একটিমাত্র বস্তু তার, হারাবার। —- এখানেই সে পুরো মজুরগোত্র নয়।” --- বুদ্ধকে চিঠিতে লিখেছিল সুকুমার। লিখেছিল কুন্ডুদা-পর্বও। “ শেষ পর্যন্ত সাহাবাবু, চালু মাল, বল্লো সুকুমারবাবুর আপত্তি না থাকলে ওর কোনো অসুবিধা নেই। ভেবেছিল আমি রাজি হবোনা। কুন্ডুদা আগেই বলেছিল আমাকে। আমার এই ছাত-কোঠার ফ্লোরে ঘুমাবে বিছানা পেতে। আমার আর অসুবিধা কি? একমাত্র অসুবিধা হাত-মারা। তোকে তো বলেছি, যে, রাতে ছাতে দাঁড়িয়ে, বসে —- আমি অনেকবার হাত মেরেছি। কুন্ডুদা আমার রুমে থাকলে সেটাই করব। তাই আমি সাহাকে বললাম, আমার আপত্তি নেই। কুন্ডুদার ঠাঁই হলো আমার কোঠার ফ্লোরে। তবে সে'ও দিন পনেরো। পরমেশ সেনের হাতে ধরা পড়ে গেল বেচারা। নাস্তানাবুদ হলো। ভেবেছিলাম আমাকেও ঘাঁটাবে কুন্ডুদা কে ওর বালের অফিসার্স চয়েস এ থাকতে দেওয়ায়। কিন্তু আমার চোট টে গেলো সাহার উপর দিয়ে।
এই দিন পনেরো তে দেখলাম কুন্ডুদা আশ্চর্য পাঠক। আগেও, আমার কোঠায় এল বাংলা বইপত্র দেখতো উল্টেপাল্টে। যে কদিন ছিল, প্রত্যেক রাত্রে পড়তো। মেইন লাইট যতোক্ষণ আছে তো পড়েই যাবে। পরে আমি ঘুমালে, আমার টেবিল লাইট নিয়ে পড়তো। আমার সঙ্গে সুলভ সংস্করণ যে বংকিম উপন্যাস সমগ্র ছিল, দুই খন্ডই কুন্ডুদাকে দিয়ে দিলাম। বংকিমের অনেক উপন্যাসই কুন্ডুদার পড়া ছিল। “ভোলগা থেকে গঙ্গা” গিল্লো গোগ্রাসে।… ম্যাগাজিন খুঁজে খুঁজে আমার গদ্য-পদ্য পড়লো।…. এরকম একজন পাঠক যে পাবো জীবনে ভাবিনি। মুখে মুখে নিজ শ্রেণী-চরিত্র ভেঙ্গে বেরোনোর কথা বল্লেও, অবচেতনে যে পেটি বুর্জোয়াত্ব, তা বংশানুক্রমিক।”
দিনের কাজ চলেছে আরম্ভ হ'তে। এরপর সারাদিন আর ফুরসত মিলবেনা —- না স্বপনের, না কুন্ডুদার। ওই কথা ভেবেই বোধহয় কুন্ডুদা আবার বল্লোঃ “কি ইঞ্জিন সাহেব, মনমরা দেখাচ্ছে কেন?” সারাদিন আর ফুরসত মিলবেনা —- না স্বপনের, না কুন্ডুদার। ওই কথা ভেবেই বোধহয় সুকুমারের মনে হলো, সব কথা এদের খুলে বললে কেমন হয়?