Saturday, November 30, 2024

৫। নটী-কথা

 ৫। নটী-কথা

নটীখাল বহিছে মন্থরে।
শোনা যায়,কান-মধু গ্রামের জমিদার, দূর দেশ থেকে আনাচ্ছিলেন এক নর্তকীকে । তাঁর নতুন নাচঘর উদ্বোধন করবার জন্য। বুদ্ধ ভাবে, সেই আমলে এই অঞ্চলে ‘নাচঘর’, নির্ঘাৎ জমিদারটি দেখে এসেছে ঢাকা-কইলকাত্তা গিয়ে। এই তল্লাটেও জমিদারগণ কেচ্ছা কেলেঙ্গকারি, চোটপাট সহ থাকলেও নাচঘরের নিদর্শন নেই। সম্ভবত এই সকল চিরস্থায়ী বন্দ্যোবস্তের পরের আমল, যখন দেশগ্রাম ছেড়ে জমিদারদের শহুরে হওয়া এবং অন্তিমে উচ্ছনে যাওয়ার হিড়িক।
    গল্প-মতে তখন বর্ষার সময়। কথক মামুদালির ভাষায়, ‘জলের দিন’। নর্তকীর নৌকা আসছিল ‘বড় নদী’ দিয়ে। বড় নদী মানে, খুশিয়ারা হয়ে। সপ্তাহ-দুই ভেসে ভেসে নোকা যখন ভিড়লো ঘাটে, তখন নর্তকী নারাজ মাটিতে পা রাখতে। জলে ভাসতে ভাসতে তখন তার জলের নেশা গিয়েছে ধরে।
“হয় নাচঘর অব্দি নৌকায় যাবো নয়তো ফিরে যাবো”। বায়না সুন্দরীর।
এদিকে পাঁজি দেখে, পুঁথি দেখে দিনক্ষণ ঠিক হয়ে আছে নাচঘর উদ্বোধনের। বাবু পড়েছেন ফাঁপরে। কি যায় করা? নৌকায় উঠে হাতে ধরছেন সুন্দরীর, পায়ে পড়ছেন সুন্দরীর। তোফা দিচ্ছেন। মোহর দিচ্ছেন। লিখে দিতে যাচ্ছেন ঘর গেরস্থির কাগজ। কিন্তু সুন্দরী নারাজ। তার এক কথাঃ “হয় নাচঘর অব্দি নৌকায় যাবো নয়তো ফিরে যাবো”।
এই গল্প এখনো বলেন মামুদালি। এখন বৃদ্ধ মামুদালি। বুদ্ধ-সুকুমার’দের শুনিয়েছেন, এই গল্পই, এক দশক আগে, অন্তত ডজন বার। প্রতিবারই গল্পে লেগেছে নতুন নতুন রঙ। হানা দিয়েছে নতুন চরিত্র। অনেকযুগ যাওয়া হয়না – না “সেটেলমেন্ট বাজার”, না’তো মামুদালি’র চা-বিস্কুট-ঘুঘনীর দোকানে।
বাবু জমিদারটি যখন নিরুপায় হয়ে প্রায় ঝাঁপ দেন খুশিয়ারার জলে তখনই এক জোয়ান মদ্দ এসে হাজির। সে বল্লো “উপায় করে দিতে পারি। কিন্তু শর্ত আছে”।
“বাবা, মাথা খাও, যা ইচ্ছে তা’ই নাও। বলো কি উপায়?”
“রাতারাতি খাল কেটে নৌকা নিয়ে যাবো আপনার নাচঘরে।”
“পারবে?”
“নিচ্চয় পারবো। না পারলে কান কাটবেন। তবে –“
“তবে আপনার নটীর সঙ্গে এক রাত ...।”
বাবুটির বুক ফাটলো। তবু বল্লেন “ কিন্তু, মানে,ও রাজি না হলে... মানে, খুব জিদ্দি মেয়েলোক কি’না। দেখতেই ত পাচ্ছ...”
“হক্‌ কথা। আমিও জোর কিছু করবো না। “না” বল্লে না-ই সই। ” আর কিছু না বলে সোজা উঠে গেলো নর্তকীর নাও’ এ। তার হাবভাব দেখে কেউ সাহস করলোনা আটকানোর।
এই বীর, মামুদালির গল্পে, মুসলমান আবার একই কিচ্ছায়, সন্তর বাজারের হরি পালের মুখে, ওই বীর-জন “হাট্টা-গাট্টা, পইতা পড়া বাবন। ব্রাহ্মণ ছাড়া এমন দম আর কার হইব?” – কিন্তু কথক হরি পাল তো নয় ব্রাহ্মণ। “এখানেই গ্রামসী’র হেজিমনি’র কথাটা বুঝতে হবে।” জেঠু বলেছিলেন। দিয়েছিলেন বুঝিয়েও।
মুসলমান হোক আর বাবনই হোক, ওই “বীর” উঠে গেলো নর্তকীর নৌকায়। তার দেখা হলো নর্তকীর সঙ্গে। কিন্তু কথা কি’যে হলো, কি’যে ঘটলো অন্দরে – জানলোনা কেউ। বার হলে এলো মানুষটি। চলে গেলো। ফিরে এলো একটু পরেই। ঘন্টার মধ্যে। সঙ্গে হাজার লোক নিয়ে ফিরে এলো। “পাহাড়ি কুলি এরা। ইখানর মাইনষে চিনইন না তারারে”। ফুটনোট মামুদালি’র। ওই হাজার হাত লেগে পড়লো খাল কাটার কাজে। পরদিন ভোরের মধ্যে খাল, জলের নূপুর বাজিয়ে দিয়ে, নাচতে নাচতে হাজির হলো বাবুর নাচঘরে। সারারাত জেগে জেগে পরিশ্রান্ত বাবু যেন নতুন জওয়ানী পেয়ে উঠে এলেন। দৌড়ে গেলেন নৌকার অন্দরে।
 “কি গো সুন্দরী, কই গো সুন্দরী...”

সাড়া নেই।
কোথায় সুন্দরী?
দেখাগেলো দাসীগুলি ঘুমে অচেতন।
সুন্দরীর খাঁচা ফাঁকা। পক্ষী নেই। নেই  খাল কাটার দায় মাথায় নেওয়া জোয়ান-মদ্দটিও।
তারপর, কোনো গল্পে, মামুদালিরই কোনো কোনো ভার্সনে, জমিদারবাবুটি দিল গলায় ফাঁস, মতান্তরে, সব ছেড়ে বার হয়ে গেলো সন্ন্যাসী হয়ে।
“তাহলে তো ওই লোকটা চোর। অন্যের মেয়েমানুষ নিয়ে পালালো”। – এই যুক্তি তুলেছে সুকুমার, মামুদালির কাছে, তুলেছে হরি পালের কাছে। মোদ্দা, সে দেখতে চায়, ওই “বীর” যদি “চোর” হয় তাহলে একে নিজ নিজ জাতের উল্কি দিয়ে, নিজ নিজ জাত’কে উচ্চাসন দেন কিনা কথকেরা। আর কথকেরা, উভয়েই, ঐ প্রশ্নের মুখামুখি এসে, দিয়েছেন একই উত্তর “আরে নাহ্‌, অই বেটা জমিদার মানুষ ভালা আসিল না। আগেও অনেক বেটি রে আনাইয়া গুম-খুন করাইসে”। –  তবে কেউ-ই, কখনোই, ওই তথ্যটি নিজে থেকে আনেননা গল্পে।
নটী গেলো। বাবুও গেলেন। কিন্তু রয়ে গেলো এই খাল। নটী খাল।
সেই নটীখালই, আজো, বহিছে মন্থরে। তার কিনারের গঞ্জ-গ্রামের সরল-মন্থরতা তার চলাতেও।
মন্থর? হয়তো ঠিক। কিন্তু সরল? অদ্যাপি? মানতে পারেনা বুদ্ধ। সতীশ দেবের লাশ প্রসঙ্গ আর তার সঙ্গে খোকাদা’র রহস্যময় মৃত্যুর মধ্যে যে যোগটির কথা, কিছু সময়ের নিমিত্ত, চলে গিয়েছিল মন, মগজের পিছন বেঞ্চিতে, তা’ই আবার দখল নেয় ফার্স্ট বেঞ্চের। বেঞ্চিতে, এর কিনারেই, কেন যে এসে বসে, বসছে বারবারই, একটি শীতের রাত,
একজন  মাতালের ঘোষণা “ভেঙ্গে গেছে। দেওয়াল ভেঙ্গে গেছে। শালা’রা শেষ। শালারা পুরাপুরি শেষ, ইন্টারনেশনেলি ডুম্‌ড ”...।

৪। নটীখাল বহিছে মন্থরে

 ৪। নটীখাল বহিছে মন্থরে



সুকুমারের মনে পড়লো মুখ, বাদল ভটের মৃত, পুঁটি-বাবু-ঘোষিত, “ইন্টারন্যাশন্যাল” কন্যাটির। 

তাঁবুর মতো খাটানো এই ধাবা। দশ দিক খোলা। ফলে টাটাবাবার ইস্পাত-গলানো-হাওয়া এখানেও ঢুকেপড়ে। তোলপাড় তোলে। উড়িয়ে নিয়ে যায় শালপাতা। উল্টে দিয়ে যায় হিসাব খাতা। দুলিয়ে দিয়ে যায় শো-পাঁচশো পাওয়ারের বাল্ব গুলি যাদের চোখ জ্বলে, বড় রাস্তার ইলেকট্রিক লাইন থেকে “হুক” মেরে আনা বিদ্যুতে। এখানের ভাষায় “কাটিয়াবাজি”। ধাবার যে মুখ হাইওয়ের দিকে, সেদিকে থেমে থাকে লরীর, ট্রাকের দল। চালক-দল নামে ধাবায়। রোটি-তড়কা খায়, রোটি-মুর্গা খায়, রোটি-শব্জি খায়, দারু খায়, চাবলও খায়। খেতে খেতে অনেকেরই চোখ চলে যায় সরু-রাস্তা বা সদর রাস্তার অনশকারে। সেখানে, অন্ধকারের সঙ্গে মিশে থাকা রোড-রেন্ডি দের খুঁজে নেয় দৃষ্টি। অপর পক্ষের দৃষ্টিও চিনে নেয়, কারা ডাকবে, কারা আসবে। আর সকল কিছুর গন্ধ ছাপিয়ে ম’ম’ করে রসুন-গন্ধ। শো-পাঁচশো পাওয়ার বাল্বদের কিনারেই ঝোলে তিনিটি-চারটি রেডিও। এক রেডিওর আওয়াজে বেড় দেওয়া যায়না গোটা চত্বর। সব রেডিওতেই বাজে একই স্টেশন। বাজে দিন রাত। যেমন এই মুহুর্তে, এই তিন চারজন মিলিয়ে প্রথমে ঘোষণা দিলোঃ “ফরমাইশ হ্যায় আপ কিঃ রাম পুর সে চিরাগ,রুস্তম, সাবিনা। রানীগঞ্জ সে পুলক, মিঠু, চিত্রা। আসাম সে …”। এইবার এরা, একত্রে, গেয়ে ওঠেঃ “ য়ে দিল্‌, হ্যায় মুশকিল জী’না ইঁয়াহা, জরা হটকে, জরা বাঁচকে, ইয়ে হ্যা বোম্বে মেরী জান”। সুকুমারের কিনারে, কাঠ বেঞ্চিতে এসে বসে দুই সর্দারজী ড্রাইভার। একজনের, যে বয়সে, স্পষ্ট ভাবেই বড়, দৃষ্টি উড়ে যায় রোড-রেন্ডি’র খোঁজে। “থালি” অর্ডার করা হয়ে গিয়েছে সুকুমারের। এবার সে একটি সিগারেট জ্বালায়। “থালি”র, শালপাতার থালায়, আসতে দেরী আছে। অন্তত পনেরো মিনিট তো বটেই। অন্য দিন হলে সে উদাস-ভান করে ঠিক লক্ষ্য করতো ওই দুই ট্রাক চালককে। টুকে নিতে তাদের নানান ডিটেল, মনে মনে। কিন্তু আজ আরকে জৈন, বাদল ভটের মড়া মেয়ে’র মুখ আর বাবলু বিশ্বাসের মাতাল কন্ঠে “ভেঙ্গে গেছে। দেওয়াল ভেঙ্গে গেছে। শালা’রা শেষ। শালারা পুরাপুরি শেষ, ইন্টারনেশনেলি ডুম্‌ড ” – সুকুমারকে ঘিরে আছে। ঠিক যেমন তখনো, তার চিল-ছাত-কোঠার বন্ধ দরজার ওই পাড়ে, ইস্পাত গলানো টাটাবাবা-হাওয়ায় উল্টেপাল্টে যাচ্ছে ওই খামটি, যা’তে রয়েছে সংবাদ – পাহাড়িয়া শহর খারলং’এর খারনাই লেকের জলে, খারলং পাব্লিক হেলথের বড় সাহেব সতীশ দেবের লাশ ভেসে উঠবার। 

সেই খামের প্রেরকজন, সেই সংবাদের পরিবেশক-জন – তখন হাঁটছে। মফস্বলের রাস্তা ধরে হেঁটে চলেছ্রে ঘরমুখো। নিত্যদিনই এই সময় তার এই ফেরা। এই রাস্তাচলা। রাত তখনো দশটার কাঁটা না ছুঁলেও স্টেশন শুনশান আর ঐ শুনশানের ভিতরে, ইস্টিশান-সিঁড়ির নিচে, গাছতলায়, অন্তত দুইজন রিক্সা চালক হাজির। নিত্যই। কিন্তু তারা এই মানুষটির দিকে তাকায় না। এই ছোকরা, এরা সকলেই জানে, হেঁটেই যায়। আস্তেধীরে, হেলেদুলে, হেঁটে যায়। সেদিনও এমনি, একটি চারমিনার সহ আস্তেধীরেই হাঁটা ধরেছিল বুদ্ধ। ভাবছিল সুকুমারকে পাঠানো চিঠিটার কথাই। পৌঁছলো কি? পৌঁছলে নিশ্চয় ফোন করবে সুকুমার। কিন্তু আজ সারাদিনও কোন ফোন আসেনি অফিসে। ফোন করেছিল বুদ্ধ নিজেও। দুইবার। একবার সুকুমারের অফিসে। অফিস টাইমে। আরেকবার, ফেরা-টাইমে, রাতে, সুকুমারের বাড়ি-মালিকের ফোনে। না পেয়ে নাম বলেছিল নিজের। বলেছিল সুকুমারকে জানাতে। বলতে, ফোন করতে। কেজানে, হয়তো কেউ-ই জানায়ই নি সুকুমারকে। 

আনমনে ঘড়ি দেখলো বুদ্ধ। রাত দশটা পেরিয়ে গেছে। মফস্বল শহর ঘুমিয়ে পরেছে ন’টা বাজতেই। রাস্তার কিনারের চল্লিশ পাওয়ারের বাল্বগুলিরো অনেকে ঘুমে। শিবুদার সাইকেল আর সাইকেল রিক্সা রিপেয়ারিং এর দোকানও বন্ধ। বুদ্ধ তবু দাঁড়িয়ে গেলো বন্ধ ওই দোকানের বারান্দায়। অপেক্ষা জেঠু কখন বেরোবেন আড্ডা সেড়ে। মোড় পেরিয়েই ‘মহানায়ক’ পত্রিকার অফিস। ওখানে বসে আড্ডা, শহরের ‘বড়’দের। এই আড্ডাকে বলা হয় ‘রাষ্ট্রসংঘ’। আড্ডা সেড়ে হেঁটে হেঁটে বাড়ি ফেরেন  জেঠু। এই রকম সময়েই। ওই  সময়টা  তাঁর সঙ্গ ধরার চেষ্টা করে বুদ্ধ। কিন্তু আজ কি খুব বেশি দেরী হয়ে গেলো যে “রাষ্ট্রসঙ্ঘ”ও গেছে বন্ধ হয়ে? সামান্য উঁকি দিয়ে দেখবার চেষ্টা নেয় বুদ্ধ। নাহ, আলো জ্বলছে তখনো। দেখা যাক আরো মিনিট দশ। আরেকটা সিগারেট জ্বেলে নেয় বুদ্ধ। তার চাকরি নীলাম বাজারে। সুকুমারের মতে “যে বাজার হইতে কোহিনূর হীরা খরিদ করা হইয়াছিল”। চাকরীসূত্রে সেখানে একটি বাসস্থানও প্রাপ্য বুদ্ধ’র। কিন্তু মন টেঁকেনা। করিমগঞ্জ থেকেই সে করে যাতায়াত। “ডেইলী প্যাসেঞ্জারী”। জেঠু  রিটায়ার করেননি এখনো।  ফলে দিনে তাঁকে পাওয়া যায়না প্রায়। ছুটির দিনে গেলেও একা পাওয়া মুশকিল। কেউ না কেউ থাকেই তাঁর কাছে। ফলে রাতের ঐ নিঝ্‌ঝুম সময়টুকুর অধিকার বুদ্ধ ছাড়তে চায়না সচরাচর।

রাষ্ট্রসংঘ’ আড্ডা সদ্য শেষ। বোঝা যায়। কারন যে  মানুষটিকে দেখাযায় স্কুটারে চাপতে, তাঁর পরে আর একজনই থাকে বাকি। জেঠু। ।  পানুবাবুর স্কুটার স্টার্ট নিতে নিতেই দেখা যায়  পাজামা-পাঞ্জাবী পরিহিত, একজন লম্বা মানুষ, মুখে জ্বলন্ত সিগারেট নিয়ে বার হয়ে এলো রাষ্ট্রসংঘ থেকে। হাঁটতে হাঁটতে এগিয়ে এলো মিশন রোডের মোড়ের দিকে। ওই মানুষ – জেঠু। ঐ জ্বলন্ত সিগারেট– চারমিনার। বুদ্ধ তার প্রায় সদ্য জ্বালানো চারমিনারটা পায়ে পিষে নিভিয়ে দিয়ে এগিয়ে যায় তাঁর দিকে। ডাক দেয় ‘জেঠু’ ।

জেঠু থামেন। বলেনঃ ‘ও, তুই আইস্‌স – চল্‌’।

শুরু হয় পথচলা। কথায় কথায়। 

কথা। কতো কথা। আজ। অন্য দিন। সব দিন। 

কি কথা এতো সদ্য যৌবন ছোঁয়া এক যুবক আর ষাটের কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়া এই মানুষটির?

কথা। তবে কাজের নয়। অ-কাজের।

-কাজের? কাজ আর অ-কাজের, -কাজ আর কু কাজের সংজ্ঞা গুলি, দূরত্ব, ভেদরেখাগুলি স্পষ্ট নয় বুদ্ধর কাছেও। তবে সুকুমার বা সমরবিজয় দিগের মতো সব সংজ্ঞার মুখামুখি দাঁড়িয়ে, বাইরে, চ্যালেঞ্জ করেনা বুদ্ধ। সে ভাবে। ভাবে, যেমন এই মুহুর্তে, মাণিক বন্দ্যোপাধ্যায়, তারাশংকর, বিভূতিভূষণ, ফ্রেজারের ‘গোল্ডেন বাউ’, মানবেন্দ্র নাথ রায় থেকে মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধায়, শিবনাথ শাস্ত্রি’র শিশুদের জন্য রচনা থেকে প্রেমেন মিত্তির, লীলা মজুমদার হয়ে সত্যজিৎ রায় অথবা  ‘বোমার ভয়ে বার্মা ত্যাগ’হেন না শোনা নাম, না-জানা কাহিনী – এ সকল যদি অ-কাজের হয়, তবে “কাজ” ঠিক কোন জিনিস? জেঠু যদিও ইতিহাসের পন্ডিত, ইতিহাস কেন্দ্রীক লেখালেখি ও গবেষণার জন্যই তাঁর মূল খ্যাতি তথাপি তিনি প্রকৃত প্রস্তাবে সাহিত্যেরি মানুষ। সিগারেট ও তাঁর নিজের সম্পর্ক নিয়ে লেখা গদ্যটি বুদ্ধ ফোনে পড়ে শুনিয়েছিল সুকুমারকে। সুকুমার পরে, শোনায় সময়বিজয়কে।

শুরু হয় পথচলা। কথায় কথায়। হাঁটতে হাঁটতে। সতীশ দেবের লাশ প্রসঙ্গ আর তার সঙ্গে খোকাদা’র রহস্যময় মৃত্যুর মধ্যে যে যোগটির কথা ভেবেই শিউরে উঠেছিল বুদ্ধ, তুলি-তুলি করেও ওই কথাটা তোলেনা বুদ্ধ। কেন কে জানে। তার চিঠি পেয়ে সুকুমারও কি শিউরে উঠবে? ভাববে একই কথা

কথায় কথায়, হাঁটতে হাঁটতে – আসছে, চলে যাচ্ছে বনমালী রোডে যাওয়ার বাঁশের সাঁকো, রেশন-দোকানের মুখোমুখি বাঁশঝাড়, থানা-টিলা, নীচের যমজ বট। তারপর বাঁদিকে পর পর দুটো গলী। মধ্যে পুকুর। দ্বিতীয় গলীটি গিয়ে মিলেছে নটী খালের সমান্তরাল লঙ্গাইরোড গামী রাস্তায়। ঐ গলীরি প্রান্তে ‘দুলাল কুঠি’। জেঠুদের বাসা। তরজা-বেড়ায় ঘেরা। বাঁশের গেট। ওই গেটের সামনে দাঁড়িয়ে আরো কিছুক্ষন গল্প-গাছা। তারপরে জেঠু ঢুকে যান গেট ঠেলে।

 বুদ্ধ আবার  সিগারেট ধরায়। হাঁটে। মর্মে সুকুমারকে পাঠানো চিঠিটার কথাও হাঁটে। আর এই হাঁটার পাশে পাশে, ‘Quiet Flows The Don’? নাহ।   

নটীখাল বহিছে মন্থরে।




Friday, November 29, 2024

৩। দেওয়ালের প্রবেশ

৩। দেওয়ালের প্রবেশ



পরীক্ষা শেষ হয়। শেষ হয় “ড্রইং” আর “হস্তলিপি” দিয়ে। আসে আরকে জৈনের ফাইন্যাল। বাবার সঙ্গে গিয়ে একদিন তারা দুইভাই দেখে আসে সেই ফাইন্যাল ম্যাচ – আসাম পুলিশ আর মণিপুর রেজিমেন্টের খেলা। বাঁশের বানানো প্রতিটি টিকিট ঘরের সামনের ভিড়ই উপ্‌চে ওঠে চলেগেছে হয় বড়ো রাস্তায় নয়তো সিভিল কোর্টের আঙ্গিনা পেরিয়ে। মাঠের পাশেই ছোট্ট টিলা। সেখানেই ডাক বাংলো। টিলার যতোটা সম্ভব টিন দিয়ে ঘেরাও করা হলেও টিলায় ঊঠে পরেছে বিন্‌টিকিটের দর্শকেরা। ভিড় জমেছে সিভিল কোর্টের ছাতেও। শীত দুপুরের রোদের মায়া আলস্যের মতো ছড়িয়ে রয়েছে সর্বত্র। ভিড়ের আশে পাশে,ভিড়ের খাঁজে খাঁজে খুলেগেছে পানবিড়ির দোকান, এসেছে ‘জাটিঙ্গার কমলা’র ফিরিওয়ালা-ফিরিওয়ালির দল। কমলার ঘ্রাণ ছড়িয়ে পরছে বাতাসে।

           সিমেন্টের গ্যালারীর পিছনে পাকা রাস্তা। তার ওপারে ‘ট্রেজারী অফিস’। সেই অফিসের বারান্দায় কমলা হাতে দুইভাইকে দাঁড় করিয়ে রেখে বাবা গেলো টিকিট করতে। ফিরে এলো সিমেন্ট-গ্যালারীর প্রায় সামনের দিকের তিনটে টিকিট নিয়ে। তখনো মফস্বলে ইস্কুল-কলেজের মাষ্টারমশাইদের এটুকু সন্মান ছিলো যে তাদের কে ভিড়ে দাঁড়াতে দেখলে ছাত্র বা প্রাক্তন ছাত্রেরা এসে খোঁজখবর নিতো কিংবা বাসে ট্রেইনে ছেড়ে দিতো সীট। সুকুমারদের বাবারো কোনো প্রাক্তন ছাত্রই বাবাকে যোগাড় করে দিয়েছিল ঐ টিকিট তিনটি । নতুবা ফাইন্যালের দিনে সিমেন্ট-গ্যালারীর টিকিট পাওয়া ছিল সর্বৈব অসম্ভব। বাবার নেতৃত্বে, ভিড় ঠেলে তারা ঢুকতে লাগলো ভিতরে আর চালচিত্রে বাজছে “ও রামা রামা রামা , রামা রামা রে” …।

রামা রামা রামা রামা” ? কিন্তু ঐ গানের অন্দরে এই কথা গুলি কে দিল ঢুকিয়ে “দর্দ বন্‌ কে যো মেরে দিল মে রহা ঢল্‌ না সকা, জাদু বন্‌ কে যো তেরে আঁখো মে রুকা, চল না সকা” …। গোলমালে পড়ে গেলো সুকুমার। টাটাবাবা শহর ছাড়িয়ে সে ছিল অনেক অনেক দূরে। হয়তো অন্য গ্রহেই ছিল সে। এইবার টের পেলো আবহে শীত নয়, গরম বাতাস। টাটাবাবার ইস্পাত-পোড়ানো বাতাসে সে দাঁড়িয়ে আছে সিং-মহলের ছাতে। টের পেলো ইথারের তরঙ্গে ভেসে তালা্ত মমুদ এসে আটকা পড়েছেন রাজকুমার সিং’ এর  চার-বড়-ব্যাটারীর রেডিওতে। তাহলে কি তাকে ফিরতে হবে? এখুনি? এই গ্রহে? টাটাবাবার গ্রহে? ছাত পার হয়ে গিয়ে দাঁড়াতে হবে দরজার সামনে? চাবি ঘুড়িয়ে এখুনি খুলতে হবে তালা? তুলে নিতে হবে মেঝেতে এলোমেলো শুয়ে থাকা খাম, ইনল্যান্ড, পোস্টকার্ড গুলি? জেনে নেবে ওই খবর, পাহাড়িয়া শহর খারলং’এর খারনাই লেকের জলে, খারলং পাব্লিক হেলথের বড় সাহেব সতীশ দেবের লাশ ভেসে উঠেছিল? নাহ্‌, ছাত পার হয় না সুকুমার। চাবি পকেটে নেমে যায় সিঁড়ি দিয়ে। পেটে চিনচিনে খিদে নিয়ে সে গেট খোলে। সামান্য এগিয়ে, যায় তার নিত্য-রাতের ধাবা’তে। ধাবা’র দূরত্ব ওই গানের চেয়ে কম। সুকুমার টের পায়। কারন ধাবা-রেডিওতে তখনো তালাত মামুদ। তখনো “গা’য়ে যায়ূংগা বোহি গীত মে তেরে লিয়ে, জ্বলতে হ্যায় জিসকে লিয়ে”। গানটির কিনার দিয়ে ঢুকে যায় সুকুমার।  সিমেন্টের বাঁধানো গ্যালারী মাত্র একটাই। তাই মাঠ ঘিরে বানানো হয়েছে বাঁশের গ্যালারী। রয়েছে দাঁড়িয়ে দেখার ব্যবস্থাও। সিমেন্টের গ্যালারীর একপাশে শামিয়ানা টাঙ্গিয়ে ‘ভি আই পি লাউঞ্জ’। ‘ভি আই পি’ বলতে শহরের ডি সি, এস পি, বরফ কলের মালিক মনোরঞ্জন বণিক, মাড়োয়ারি ব্যবসায়ী সমিতির হোমড়া চোমড়া ক’জন আর কোথাকার দুজন এমপি না এমএলএ । তাদের সামনে রাখা সার সার কাপ্‌-শীল্ড। আজকের খেলার শেষে হবে পুরষ্কার বিতরণী অনুষ্ঠান। তারি স্পেশাল ঘোষক হিসাবে শিলচর থেকে আনানো হয়েছে  কোন্‌ এক ‘দাদা’কে  যিনি শিলচর-করিমগঞ্জ-হাইলাকান্দিতে ‘গলাদা’ নামে সুবিখ্যাত। 

          ভিড়ের মধ্যে কোনোক্রমে জায়গা করে বসে পড়াগেলো। মাইকের গানও থেমেগেলো একসময়। দুই দলের খেলোয়াররা এসে দাঁড়ালো মাঠের মাঝামাঝি। হর্ষধ্বনিতে ফেটে পড়লো দর্শকদল। সুকুমার আর সোমকও যতোটা সম্ভব চীৎকার করে নিলো এই সুযোগে। রেফারীর বাঁশিতে আরম্ভ হলো খেলা আর তখনি সুকুমারের গেলো মন খারাপ হয়ে। - এই  খেলার পরেই আর কে জৈন শেষ! মাইকের গান বন্ধ! সে শিউড়ে উঠলো এইকথা ভেবেো, যে পরীক্ষার রেজাল্টও বেরোবে একদিন। অনতিদূরেই।         

            দুই এক গোলে আসাম পুলিশকে হারিয়ে কাপ নিলো মণিপুর রেজিমেন্ট।

 না’কি ঘটলো ঠিক উল্টোটাই

ধাবার কাঠ-বেঞ্চিতেবসে আজ আর মনে পড়েনা। মনেপড়ে  আলো কমে আসছে বলে পুরষ্কার বিতরণীর জন্য জ্বালানো হলো বড় বড় লাইট। মফস্বলে বলা হতো ‘ফ্লাড্‌ লাইট্‌’।  কিন্তু মাথার উপরে হিম পড়ে ঠান্ডা লাগতে পারে বলে বাবাসুকুমার-সোমক কে নিয়ে ফিরে এলো পুরষ্কার বিতরণী শেষ হওয়ার আগেই। রিক্সা পাওয়া গেলোনা বলে পুরো রাস্তাই আসতে হলো হেঁটে। পাড়ায় ঢুকে মনেহল কি যেন নেই। যেন আরো মিট্‌মিটে হয়েগেছে বাড়িঘরের ষাট কিংবা আশি পাওয়ারের বাল্বগুলি। ... ...শেষ হয়েগেলো আরকে জৈন। এখন, ক্রমে খুলে নেওয়া হবে ঢেউ-টিনের ঘেরাটোপ, তাদের ইস্কুল-মাঠ ঘিরে। উঠে যাবে অস্থায়ী টিকিট ঘর, তাঁবু। ইস্কুলের কোঠা খালিকরে চলে যাবে খেলোয়াড়ের দল।  ইস্কুলের আশেপাশে,পথে ঘাটে, পড়ে থাকবে টিকিটের ছেঁড়া টুকরো,পোষ্টার। সে’ও কিছুদিন, কয়েকদিন। তারপর তাদেরো উড়িয়ে নিয়ে হাওয়া, বাতাস, বৃষ্টি, বাদল। 

বাদল ভটের মেয়ে কি তবু থেকে যাবে ইন্টারনেশন্যাল হয়েই

 বাদল ভটের ওই মেয়েটি মারা গেলো ওই বছর কিংবা বড়জোর আরো এক দেড় বছর পরে। এলো, গেলো আরো শীত, আরো আরকে জৈন টর্নামেন্ট। কিন্তু পরীক্ষার সঙ্গে আরকে জৈনের চার মাসের ফারাক স্থির হয়ে গেলো পরের বছর থেকেই। কে জানে পরের আরকে জৈন বছর গুলিতে আর কোন্‌ কোন্‌ মেয়ে, কার কার মেয়ে, আদৌ কোনো মেয়ে আদপেই “ইন্টারন্যাশন্যাল” হতে পেরেছিল কি’না। তবে “বাদল ভটের মেয়ে এখন ইন্টারনেশনেল” এই ঘোষনার মতোই আরো একটি ঘোষনা সাইরেন-হেন শোনা গিয়েছিল আরেকবার। এক মধ্যরাত্রে। ঘোষক-কন্ঠ মদে চোবানো হলেও, এ’যে মাতাল বাবলু বিশ্বাস, তা নিশ্চিত বলে দিতে হয়নি কাউকে। প্রাক্তন ওয়ার্ড কমিশনারটি বাড়ি ফিরতো মধ্যরাত্রি কে ছিঁড়ে, প্রতি রাতেই। তবে এমতো উৎফুল্ল ঘোষণা সচরাচর শোনেনি পাড়ার লোক। রাত্রিটি শীতের। ঘন, জমাট কুয়াশার। বাঁশ-পাতা থেকে টুপটাপ শিশির-ঝরার। শহরেরো সারা গা’য়ে কুয়াশা-মশারি। সেই মশারি ছিঁড়ে গেলো বাবলু বিশ্বাসের মাতাল কন্ঠে “ভেঙ্গে গেছে। দেওয়াল ভেঙ্গে গেছে। শালা’রা শেষ। শালারা পুরাপুরি শেষ, ইন্টারনেশনেলি ডুম্‌ড ”...। ইত্যাদি। এই ঘোষণার কেন্দ্রে, যা বোঝা গেলো একটি দেওয়াল ও তার ভেঙ্গে যাওয়া এবং সেই ভেঙ্গে যাওয়ার মূল্যে কোনো “শালা” রা “ইন্টারনেশনেলি শেষ”। 

এই দেওয়ালটি ও তার ভেঙ্গেপড়ার প্রচার, এইভাবেই, সত্য-মিথ্যা, বোঝা-না বোঝা মিলিয়েআরো বহু বহু মাতাল, বিশ্বময় ছড়িয়ে দিয়েছিল তখন। একদল ওই মাতাল বাবলু বা পুঁটি-বাবু’র মতোই নেচে উঠেছিল “শালারা ইন্টারনেশনেলি শেষ” বলে। আরেকদল, বা আরো অনেক দলই নিজ নিজ বৃত্ত-দাদা’দের অথবা পার্টির সেন্ট্রাল কমিটির মুখ চেয়েছিল ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের আশায়। 

তখনকার মফস্বলে ডিটিপি ছিলনা। ফলে, সেই “বড়ো এবং “প্রতিষ্ঠিত” পত্রিকা-মালিকদের ভাষার যা অদ্যকার “মাশরুম লোকাল”, সেই পত্রিকাগুলি ছিলনা। ছিল বাসি কলকাত্তাই পত্রিকা । সেই সকল “বড়” পত্রিকা দিগের দ্বারা ঘোষিত ও প্রতিষ্ঠিত “ইন্টেলেকচুয়াল” দের মতামত, ওই সব কাগজের ভাষায় আউড়ে যাওয়াই, মুষ্টিমেয় কয়েকজন বাদে, ছিল “বুদ্ধিজীবিত্ব”।  সটীক কলকাত্তাই মুদ্রিত ভার্সনের আগেই অবশ্য ইথার বাহিত হয়ে সংবাদটি পৌঁছে গিয়েছিল প্রকৃত পিপাসুদের কাছে। সেই পিপাসু তথা নিজ মগজকে নিজস্ব ভাবে প্রয়োগ ক্ষমতার অধিকারীদের সংখ্যা ছিল অতি নিগণ্য। ফলে , দিন দুই বাদে, কলকাত্তাই “নিউজ পেপার” গুলিই মফস্বলের হাটে হাঁড়ি ভাঙলো। ‘খাস’ খবর কে “আম” করে দিল। সেই  মধ্যরাত্রেই বাবলু মাতালও দিয়েছিল ওই রায় “শালারা শেষ। ইন্টারনেশনেলি শেষ”। 

সুকুমারের মনে পড়লো মুখ, বাদক ভটের সেই মৃত, পুঁটি-বাবু-ঘোষিত, “ইন্টারন্যাশন্যাল” কন্যাটির।





২। অথ পুঁটি-বাবু উবাচ

২। অথ পুঁটি-বাবু উবাচ

সন্ধ্যা আর রাতের মাঝামাঝি এই সময়টায় হাওয়া আসে। আসে কোনো সমুদ্র, নদী থেকে, নিশ্চয়। কিন্তু টাটাবাবার মানচিত্রে ঢুকে পড়া মাত্র, আর সমস্ত চরিত্র হারিয়ে, হাওয়াও যায় ঝলসে৷ পুড়ে। যেন টাটাবাবাবার কারখানা অন্দরের ফার্নেস গুলির, সেই বিরাট সব চুল্লী গুলির দাউ দাউ, পোড়া গন্ধপোড়ানো গন্ধ বিলিয়ে বেড়ানোর হরকরা’ই হয়ে ওঠে সে। সে, মানে, বাতাস। 

                       সে, মানে, বাতাস, আসে সিং মহলেও। এসে, আর দিনের মতোই, সিং মহলের ছাত ধরে উড়ে গিয়ে,ছাত-প্রান্তের ছোট কোঠাটিতে ঢুকে পরে চৌকাঠের ফাঁক গ'লে। আর-দিনের মতোই। আর-দিনের মতোই যখন, সে, বাতাস, হাওয়া, উল্টেপাল্টে দিচ্ছে, চৌকাঠের ওইপাড়ে,মেঝেতে  ছড়িয়ে থাকা দুটি তিনটি চিঠিকে, পত্রিকাকে, তখন, সুকুমার, টাটাবাবার গ্যাসবাতি ঝলসানো আকাশ-টুকরোর বিপরীতে, যে টুকরো অন্ধকার, সে দিকে নিবিষ্ট হয়ে, সেই অন্ধকার ফুঁড়ে, অন্য দিনের মতোই চলে গেছে অনেক দূর।

মনে মনে তার এই যাওয়া আসা, আসা যাওয়া চলে, চলতেই থাকে, সর্বক্ষণ। কিন্তু দিনের, কাজের, কোলাহল তখন মন-পুকুরের গা'য়ে ফেলেরাখে যে শ্যাওলা-আস্তর, তাতে, মনের ওই যাওয়া আসা, আসা যাওয়া, সম্পূর্ণ টের পায়না মনও। তবে দোলা খায় শ্যাওলাদাম। ‘আনমনা’ শব্দটি যায় মন-দরজায় টোকা দিয়ে। সারাদিনের সেই সমস্ত দোলা, টোকা, ধাক্কা —- ঢেউ হয়ে উঠে আসে সন্ধ্যায়। শ্যাওলা-প্রচ্ছদ ছিঁড়ে আমূল সুকুমারের দখল নেয়। প্রায় প্রতিদিনই, উড়তে উড়তে, সে হানা দিতে চায় প্রথম পৃষ্ঠায়, অথবা প্রথম পৃষ্ঠা থেকে পড়তে পড়তে, আসতে চায়, আজকের, তন্মুহুর্তের, পাতাতে। যেমন এই মুহুর্তে চোখে ভাসছে একটি মেঘলা বিকাল। মফস্বলের। সেই বিকাল, মেঘলা ছিঁড়ে উঠে আসছে একটি স্বরঃ “বাদল ভটের মাইয়া অখন ইন্টারনেশনেল”।

বাদল ভটের মেয়ে এখন ইন্টারনেশনেল” – ঘোষনা করেছিল বাবু। পুঁটি-বাবু। পুঁটি, কেননা পুঁটিমাছের মতো ছোটখাটো আর কাঁটাও তেমনি। নামটি হয়, বাবু। দুয়ে মিলে পুঁটি-বাবু। ঘোষনা করেছিল এক মেঘলা বিকালে, প্রত্যন্ত মফস্বলি বিকালে, রকেট-বেগে সাইকেল চালিয়ে, সারা পাড়া ঘুরে ঘুরে - “বাদল ভটের মেয়ে এখন ইন্টারনেশনেল”।  এখানে “ইন্টারনেশনেল” অর্থে, মেয়েটিকে দেখতে পাওয়া, আমাদের সীমান্ত শহরে, “আর কে জৈন” টর্নামেন্টে ফুটবল খেলতে আসা, বাংলাদেশের এক খেলোয়াড়ের সঙ্গে। “আর কে জৈন” শব্দটি বেজে উঠলো। বেজে উঠলো কিশোরকুমারের কন্ঠেঃ ‘ ও রামা রামা রামা রামা / রামা রামা রে / মেনে মানা মেনে মানা মে হুঁ মাওয়ালী /মাওয়ালী হুঁ মে / শয়তান তো নেহি /গিরা হুয়া কোই ই তো নেহি /ও রামা রামা রামা রামা  রামা রামা রে...’। সুকুমারকে ঘিরে নেমে এলো শীত। শীত ঋতু। 

শীতের মাঝামাঝি। বাতাসে হিম। ঘাসের শরীরে শিশির। জাটিঙ্গা-কমলার ঘ্রানে বাজার ম’ম। ফুরিয়ে আসছে ইংরেজি বছর। প্রতি বছরেই এই সময়ে চোঙ্গা-মাইক ঝুলিয়ে শহরময় ঘুরে বেড়ায় সাইকেল রিক্সা। নানা চোঙ্গা’য় নানা বার্তা। “করিম-মঞ্জ শঅরে সার্কাস, জেমিনি সার্কাস, আসুন দেকুন, সপরিবারে”। “ত্রিপুরা রাইজ্যের বিক্যাত যাত্রাপার্টি, মাকাল অপেরা, মহাকাল অপেরা… রুজ সিন্ধ্যা থেকে দুইটি পালা”। … “করিমগঞ্জো শহরবাসীকে আরকে জৈন ফাউন্ডেশনের অবিনন্দন। আবারো এসে পরলো বিক্যাত আরকে জৈন ফুটবল টুর্নামেন্ট। ইন্টারনেশনেল টুর্নামেন্ট। মনে রাকবেন অন্তর-জাতির টুর্নামেন্টে যুগ দিচ্ছেন বাংলাদেশের রাজিশাহী থেকে …”। ইত্যাদি ইত্যাদি। 

তখন ক্লাস সিক্স। হঠাৎই আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে বাজনা  ‘ ও রামা রামা রামা রামা   রামা রামা রে’। চলছে বাৎসরিক পরীক্ষা আর সুকুমারদের ইস্কুলেরই মাঠ ঘিরে দেওয়া হয়েছে ঢেউ-টিনের ঘেরাটোপে। দিকে দিকে মাইক। বাক্স লাউড্‌ স্পীকারের জমানা মফস্বলে আসেনি তখনো। খেলা আরম্ভ হলে ঐ সব মাইকে চলে ধারা বিবরণী আর বাকি সময় বাজতে থাকে গান। কখনো “রামা রামা রামা রামা রামা রামা রে”, কখনো “ঝ ঝ ঝোপ্‌ড়ি মে চা চা চারপাই/ জীবন মেরা উসি পর্‌ হি...” ...ইস্কুলের ক্লাসঘরে বসে পরীক্ষার খাতায় ভূগোল,ইতিহাস কিংবা বিজ্ঞানের প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতে মন হারিয়ে যায় ঐ সব অদ্ভুত কথার,উদ্ভট সুরের টানে। ডিসেম্বর মাসে বাৎসরিক পরীক্ষা হওয়ার রীতি’র সেই শেষ বছর। পরের বছর থেকেই বাৎসরিক পরীক্ষার মাস হয়ে গিয়েছিল গ্রীষ্মে। এপ্রিল মাসে।



          খেলা আরম্ভ হয় বিকাল চারটেতে। টিকিট কাইন্টারের সামনে ভিড় বাড়তে থাকে তিনটে থেকেই।  রিক্সাওয়ালা থেকে কলেজ শিক্ষক, জজ্‌-মেজিস্ট্রেট্‌  সকলেই উপস্থিত ঐ ভিড়ে। সেমি ফাইন্যাল আর ফাইন্যালের দিনে ছুটি দেওয়া হয় ইস্কুল কলেজ। ছেলে বুড়ো বাচ্চা এমনকি বাড়ির মহিলারাও এসে হাজির হন সেই খেলা দেখতে। শীতের মাঝামাঝি। বাতাসে হিম। ঘাসের শরীরে শিশির। জাটিঙ্গার কমলার ঘ্রান বাতাসে ম’ম। ফুরিয়ে আসছে ইংরেজি বছর। “নেতাজী মেলা” এসে পড়লো বলে। ঠিক এই সময়েই ইংরেজি নতুন বৎসরে আর “নেতাজী মেলা” দুয়েরই আগমনী হয়ে আরম্ভ হয় এই ফুটবল টর্নামেন্ট্‌। আর কে জৈন স্মৃতি ফুটবল  টর্নামেন্ট্‌। মফস্বলের বুকে যেন এসে হানা দেয় এক ঝলক  টাট্‌কা দমকা বাতাস। খেলতে আসে  ‘এ ডিভিশন’ দলগুলি— মিজোরাম,ত্রিপুরা,নাগাল্যান্ড,মনিপুর থেকে। আসে আসাম পুলিশের দল। আন্তর্জাতিক দল আসে কুশিয়ারা নদী পারহয়ে। বাংলাদেশ থেকে। খেলোয়াড়দের সবার স্থান সংকুলান হয়না মফস্বলি হোটেলে,মোটেলে। ডাক বাংলোতেও ওঠেনা কুলিয়ে। ফলে তাঁবু পড়ে খেলার মাঠের পাশে। খেলোয়াড়দের তাঁবু। আমাদের ইস্কুলবাড়ির কোঠাতেও আশ্রয় নেন খেলোয়াড়ের দল। আমরা গিয়ে ভিড় জমাই সেই কোঠাগুলোর আশে পাশে। হাঁ করে দেখি তাদের জুতো,জার্সি,তাদের পৌরুষ। তাদের বীরত্বগাথা ছাপাহয় আঞ্চলিক কাগজে। গতি,সোনার কাছাড়ের কাটতি বেড়েযায় হুহু করে। 

সুকুমারের মর্মে ফিরে আসে সেই দিন-গোনা’র দিন – কবে শেষহবে এই কালান্তক বাৎসরিক পরীক্ষা আর মিশে যাওয়া যাবে ওই সকল উৎসবে। শীতের উৎসবে। সেই সঙ্গে, এখন, এ’ও মনে হয় সুকুমারের, যে, আবাল বৃদ্ধ বণিতার এই হাজির হওয়ার গহনে যতো-না ছিল ফুটবল প্রীতি তার চেয়ে ঢের বেশী উদ্দীপনা এক রকমের উৎসবের। আমোদ, সার্কাস দেখার। 

পরীক্ষার সময় একেক বেঞ্চিতে বসানো হয় মাত্র দুজন করে। বেঞ্চির দুই মাথায় দুইজন। তা’ও আবার দুইজন দুই ক্লাসের। সুকুমার ক্লাস সিক্স। তার প্রতিবেশী “সেভেন”। ফলে লাভ হয়না উঁকি ঝুঁকি দিয়েও। পরীক্ষা চলে দুই বেলাই। দশটা থেকে একটা। দুইটা থেকে পাঁচটা। 

অন্য ইস্কুলের নিয়ম আলাদা। তাদের ‘সকাল’ মানে ন’টা থেকে বারোটা। ‘বিকাল’ মানে একটা থেকে চারটা। সেবার সুকুমারের সব পরীক্ষাই পরেছিল  বিকালে।  সীট পড়েছে ইস্কুলের যে কোঠাগুলি বড় রাস্তার দিকে, তারই একটাতে। ফলে চারটা বাজতে না বাজতেই জানালা দিয়ে দেখা যায়  ‘মদন মোহন মাধব চরণ উচ্চতর মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ে’র বালিকারা নেমে পড়েছে রাস্তায়। ফ্রক পড়ে, শাড়ি জড়িয়ে – যেন চলেছে দলে দলে উড়ন্ত প্রজাপতি। সুকুমারের বসা কোঠার যে পাশে, বড় রাস্তা তার উল্টোদিকে। তাই ঐ দিকে দেখতে গেলে দেখতে হয় ঘাড় ঘুড়িয়ে। সুকুমার ঘাড় ঘোরায়। একবার – দুইবার – তিনবার – মাষ্টার মশাই না দেখলেও দেখে ফেলে প্রতিবেশী, ক্লাস সেভেনের ‘দাদা’। সে ভালো ছেলে। বাঁদিকে সিঁথি কেটে, পরিষ্কার জামা কাপড় পরে আসে পরীক্ষা দিতে। ধীরে সুস্থে লেখে। তারপর ‘রিভিশন’ দেয় খাতা জমা দেওয়ার আগে । পরে আলাপ পরিচয় হয়েছিল তার সঙ্গেও সুকুমারের।  তার নাম ‘সৌমিত্র’,তার বাড়ি ‘পাগলা পট্টী’ আর ‘হাসপাতাল রোড’ এর ‘জাংশনে’। সুকুমারের এই উঁকি ঝুঁকি, বালিকা দেখবার আগ্রহ, পছন্দ হলোনা সৌমিত্রর। ঘাড় ঘুরিয়ে বল্লোঃ ‘জানালার দিকে তাকিয়ে থাকলে লিখবি কখন?’ – সত্যিইতো! সুকুমারও ভাব্লো “লিখবো কখন? আর যে বাকী মাত্র আধঘন্টা সময়! এখনো উত্তর লেখা হয়নি তিনটে বড় প্রশ্নের! আর কে জৈনের মাইকে গান থেমে শুরু হয়েগেছে “রীলে”!” সুকুমার  চেষ্টা নেয়, প্রতিদিনইপ্রশ্নোত্তরে মন দেওয়ার। কিন্তু মন টেনেনেয় ‘মদন মোহন মাধব চরণ উচ্চতর মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ে’র উড়ন্ত প্রজাপতিরা। মন টেনেনেয় আর কে জৈনের রীলে। উত্তর, তিনটি প্রশ্নের, পুরোপুরি লিখে শেষ করবার আগেই বেজেযায় শেষ ঘন্টা। বাড়ি এসে বাবাকে মিথ্যে বলতে হয়। মিথ্যে বলতে হয় মাষ্টার মশাইকে। “ সব উত্তর দিয়েছি”।  “রিভিশন” দিয়েছি শেষ আধা ঘন্টা। এই সকল মিথ্যা বলবার আবডালে, প্রতিদিনই, মনে মনে ঠিক করে সুকুমার, “ আর নয় –  পরের পেপারটা দিতেই হবে ভালো করে।”  কিন্তু যেইমাত্র কানে আসে আকে জৈনের গান ‘মামামিয়া / পম্‌ পম্‌’, ‘নয়না মে সপ্‌না নয়না মে সজনা / সজনী কা দিল্‌ আ গয়া’ কিংবা ‘বক্‌ বক্‌ বক্‌ মত্‌ করো নাক তেরা লম্বা / লাকড়ি কা খম্বা...’ – তৎক্ষণাৎ মহম্মদ ঘোরী কিংবা আলাউদ্দিন খিলজীর জীবনীর বদলে চোখে ভেসে ওঠে ‘মদন মোহন মাধব চরণ উচ্চতর মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ে’র উড়ন্ত প্রজাপতিরা। চোখ অপেক্ষা করে থাকে কখন পরীক্ষা শেষ করে তারা উড়বে রাস্তায়। 

এরকমই এক আজ-পরীক্ষা-নেই দিন। শীতের আকাশেও এসেছে মেঘ। দুপুর থেকেই। পরদিন পরীক্ষা থাকলেও, কোনো মতে অনুমতি পাওয়া গিয়েছিল আধ ঘন্টা খেলতে যাওয়ার আর তখুনি “বাদল ভটের মেয়ে এখন ইন্টারনেশনেল” – ঘোষনা করেছিল বাবু। পুঁটি-বাবু। পুঁটি, কেননা পুঁটিমাছের মতো ছোটখাটো আর কাঁটাও তেমনি। নামটি হয়, বাবু। দুয়ে মিলে পুঁটি-বাবু। ঘোষনা করেছিল এক মেঘলা বিকালে, প্রত্যন্ত মফস্বলি বিকালে, রকেট-বেগে সাইকেল চালিয়ে, সারা পাড়া ঘুরে ঘুরে - “বাদল ভটের মেয়ে এখন ইন্টারনেশনেল”।  

                                   এমনি আরো একটি ঘোষনা সাইরেন-হেন শোনা গিয়েছিল আরেকবার। এক মধ্যরাত্রে। ঘোষক-কন্ঠ মদে চোবানো হলেও, এ’যে মাতাল বাবলু বিশ্বাস, তা নিশ্চিত বলে দিতে হয়নি কাউকে। প্রাক্তন ওয়ার্ড কমিশনারটি বাড়ি ফিরতো মধ্যরাত্রি কে ছিঁড়ে, প্রতি রাতেই। তবে এমতো উৎফুল্ল ঘোষণা সচরাচর শোনেনি পাড়ার লোক। রাত্রিটি শীতের। ঘন, জমাট কুয়াশার। বাঁশ-পাতা থেকে টুপটাপ শিশির-ঝরার। শহরেরো সারা গা’য়ে কুয়াশা-মশারি। সেই মশারি ছিঁড়ে গেলো বাবলু বিশ্বাসের মাতাল কন্ঠে “ভেঙ্গে গেছে। দেওয়াল ভেঙ্গে গেছে। শালা’রা শেষ। শালারা পুরাপুরি শেষ, ইন্টারনেশনেলি ডুম্‌ড ”...। ইত্যাদি। এই ঘোষণার কেন্দ্রে, যা বোঝা গেলো একটি দেওয়াল ও তার ভেঙ্গে যাওয়া এবং সেই ভেঙ্গে যাওয়ার মূল্যে কোনো “শালা” রা “ইন্টারনেশনেলি শেষ”। 

তখনো হতো কি ওই টর্নামেন্ট? আরকে জৈন?