Friday, November 29, 2024

৩। দেওয়ালের প্রবেশ

৩। দেওয়ালের প্রবেশ



পরীক্ষা শেষ হয়। শেষ হয় “ড্রইং” আর “হস্তলিপি” দিয়ে। আসে আরকে জৈনের ফাইন্যাল। বাবার সঙ্গে গিয়ে একদিন তারা দুইভাই দেখে আসে সেই ফাইন্যাল ম্যাচ – আসাম পুলিশ আর মণিপুর রেজিমেন্টের খেলা। বাঁশের বানানো প্রতিটি টিকিট ঘরের সামনের ভিড়ই উপ্‌চে ওঠে চলেগেছে হয় বড়ো রাস্তায় নয়তো সিভিল কোর্টের আঙ্গিনা পেরিয়ে। মাঠের পাশেই ছোট্ট টিলা। সেখানেই ডাক বাংলো। টিলার যতোটা সম্ভব টিন দিয়ে ঘেরাও করা হলেও টিলায় ঊঠে পরেছে বিন্‌টিকিটের দর্শকেরা। ভিড় জমেছে সিভিল কোর্টের ছাতেও। শীত দুপুরের রোদের মায়া আলস্যের মতো ছড়িয়ে রয়েছে সর্বত্র। ভিড়ের আশে পাশে,ভিড়ের খাঁজে খাঁজে খুলেগেছে পানবিড়ির দোকান, এসেছে ‘জাটিঙ্গার কমলা’র ফিরিওয়ালা-ফিরিওয়ালির দল। কমলার ঘ্রাণ ছড়িয়ে পরছে বাতাসে।

           সিমেন্টের গ্যালারীর পিছনে পাকা রাস্তা। তার ওপারে ‘ট্রেজারী অফিস’। সেই অফিসের বারান্দায় কমলা হাতে দুইভাইকে দাঁড় করিয়ে রেখে বাবা গেলো টিকিট করতে। ফিরে এলো সিমেন্ট-গ্যালারীর প্রায় সামনের দিকের তিনটে টিকিট নিয়ে। তখনো মফস্বলে ইস্কুল-কলেজের মাষ্টারমশাইদের এটুকু সন্মান ছিলো যে তাদের কে ভিড়ে দাঁড়াতে দেখলে ছাত্র বা প্রাক্তন ছাত্রেরা এসে খোঁজখবর নিতো কিংবা বাসে ট্রেইনে ছেড়ে দিতো সীট। সুকুমারদের বাবারো কোনো প্রাক্তন ছাত্রই বাবাকে যোগাড় করে দিয়েছিল ঐ টিকিট তিনটি । নতুবা ফাইন্যালের দিনে সিমেন্ট-গ্যালারীর টিকিট পাওয়া ছিল সর্বৈব অসম্ভব। বাবার নেতৃত্বে, ভিড় ঠেলে তারা ঢুকতে লাগলো ভিতরে আর চালচিত্রে বাজছে “ও রামা রামা রামা , রামা রামা রে” …।

রামা রামা রামা রামা” ? কিন্তু ঐ গানের অন্দরে এই কথা গুলি কে দিল ঢুকিয়ে “দর্দ বন্‌ কে যো মেরে দিল মে রহা ঢল্‌ না সকা, জাদু বন্‌ কে যো তেরে আঁখো মে রুকা, চল না সকা” …। গোলমালে পড়ে গেলো সুকুমার। টাটাবাবা শহর ছাড়িয়ে সে ছিল অনেক অনেক দূরে। হয়তো অন্য গ্রহেই ছিল সে। এইবার টের পেলো আবহে শীত নয়, গরম বাতাস। টাটাবাবার ইস্পাত-পোড়ানো বাতাসে সে দাঁড়িয়ে আছে সিং-মহলের ছাতে। টের পেলো ইথারের তরঙ্গে ভেসে তালা্ত মমুদ এসে আটকা পড়েছেন রাজকুমার সিং’ এর  চার-বড়-ব্যাটারীর রেডিওতে। তাহলে কি তাকে ফিরতে হবে? এখুনি? এই গ্রহে? টাটাবাবার গ্রহে? ছাত পার হয়ে গিয়ে দাঁড়াতে হবে দরজার সামনে? চাবি ঘুড়িয়ে এখুনি খুলতে হবে তালা? তুলে নিতে হবে মেঝেতে এলোমেলো শুয়ে থাকা খাম, ইনল্যান্ড, পোস্টকার্ড গুলি? জেনে নেবে ওই খবর, পাহাড়িয়া শহর খারলং’এর খারনাই লেকের জলে, খারলং পাব্লিক হেলথের বড় সাহেব সতীশ দেবের লাশ ভেসে উঠেছিল? নাহ্‌, ছাত পার হয় না সুকুমার। চাবি পকেটে নেমে যায় সিঁড়ি দিয়ে। পেটে চিনচিনে খিদে নিয়ে সে গেট খোলে। সামান্য এগিয়ে, যায় তার নিত্য-রাতের ধাবা’তে। ধাবা’র দূরত্ব ওই গানের চেয়ে কম। সুকুমার টের পায়। কারন ধাবা-রেডিওতে তখনো তালাত মামুদ। তখনো “গা’য়ে যায়ূংগা বোহি গীত মে তেরে লিয়ে, জ্বলতে হ্যায় জিসকে লিয়ে”। গানটির কিনার দিয়ে ঢুকে যায় সুকুমার।  সিমেন্টের বাঁধানো গ্যালারী মাত্র একটাই। তাই মাঠ ঘিরে বানানো হয়েছে বাঁশের গ্যালারী। রয়েছে দাঁড়িয়ে দেখার ব্যবস্থাও। সিমেন্টের গ্যালারীর একপাশে শামিয়ানা টাঙ্গিয়ে ‘ভি আই পি লাউঞ্জ’। ‘ভি আই পি’ বলতে শহরের ডি সি, এস পি, বরফ কলের মালিক মনোরঞ্জন বণিক, মাড়োয়ারি ব্যবসায়ী সমিতির হোমড়া চোমড়া ক’জন আর কোথাকার দুজন এমপি না এমএলএ । তাদের সামনে রাখা সার সার কাপ্‌-শীল্ড। আজকের খেলার শেষে হবে পুরষ্কার বিতরণী অনুষ্ঠান। তারি স্পেশাল ঘোষক হিসাবে শিলচর থেকে আনানো হয়েছে  কোন্‌ এক ‘দাদা’কে  যিনি শিলচর-করিমগঞ্জ-হাইলাকান্দিতে ‘গলাদা’ নামে সুবিখ্যাত। 

          ভিড়ের মধ্যে কোনোক্রমে জায়গা করে বসে পড়াগেলো। মাইকের গানও থেমেগেলো একসময়। দুই দলের খেলোয়াররা এসে দাঁড়ালো মাঠের মাঝামাঝি। হর্ষধ্বনিতে ফেটে পড়লো দর্শকদল। সুকুমার আর সোমকও যতোটা সম্ভব চীৎকার করে নিলো এই সুযোগে। রেফারীর বাঁশিতে আরম্ভ হলো খেলা আর তখনি সুকুমারের গেলো মন খারাপ হয়ে। - এই  খেলার পরেই আর কে জৈন শেষ! মাইকের গান বন্ধ! সে শিউড়ে উঠলো এইকথা ভেবেো, যে পরীক্ষার রেজাল্টও বেরোবে একদিন। অনতিদূরেই।         

            দুই এক গোলে আসাম পুলিশকে হারিয়ে কাপ নিলো মণিপুর রেজিমেন্ট।

 না’কি ঘটলো ঠিক উল্টোটাই

ধাবার কাঠ-বেঞ্চিতেবসে আজ আর মনে পড়েনা। মনেপড়ে  আলো কমে আসছে বলে পুরষ্কার বিতরণীর জন্য জ্বালানো হলো বড় বড় লাইট। মফস্বলে বলা হতো ‘ফ্লাড্‌ লাইট্‌’।  কিন্তু মাথার উপরে হিম পড়ে ঠান্ডা লাগতে পারে বলে বাবাসুকুমার-সোমক কে নিয়ে ফিরে এলো পুরষ্কার বিতরণী শেষ হওয়ার আগেই। রিক্সা পাওয়া গেলোনা বলে পুরো রাস্তাই আসতে হলো হেঁটে। পাড়ায় ঢুকে মনেহল কি যেন নেই। যেন আরো মিট্‌মিটে হয়েগেছে বাড়িঘরের ষাট কিংবা আশি পাওয়ারের বাল্বগুলি। ... ...শেষ হয়েগেলো আরকে জৈন। এখন, ক্রমে খুলে নেওয়া হবে ঢেউ-টিনের ঘেরাটোপ, তাদের ইস্কুল-মাঠ ঘিরে। উঠে যাবে অস্থায়ী টিকিট ঘর, তাঁবু। ইস্কুলের কোঠা খালিকরে চলে যাবে খেলোয়াড়ের দল।  ইস্কুলের আশেপাশে,পথে ঘাটে, পড়ে থাকবে টিকিটের ছেঁড়া টুকরো,পোষ্টার। সে’ও কিছুদিন, কয়েকদিন। তারপর তাদেরো উড়িয়ে নিয়ে হাওয়া, বাতাস, বৃষ্টি, বাদল। 

বাদল ভটের মেয়ে কি তবু থেকে যাবে ইন্টারনেশন্যাল হয়েই

 বাদল ভটের ওই মেয়েটি মারা গেলো ওই বছর কিংবা বড়জোর আরো এক দেড় বছর পরে। এলো, গেলো আরো শীত, আরো আরকে জৈন টর্নামেন্ট। কিন্তু পরীক্ষার সঙ্গে আরকে জৈনের চার মাসের ফারাক স্থির হয়ে গেলো পরের বছর থেকেই। কে জানে পরের আরকে জৈন বছর গুলিতে আর কোন্‌ কোন্‌ মেয়ে, কার কার মেয়ে, আদৌ কোনো মেয়ে আদপেই “ইন্টারন্যাশন্যাল” হতে পেরেছিল কি’না। তবে “বাদল ভটের মেয়ে এখন ইন্টারনেশনেল” এই ঘোষনার মতোই আরো একটি ঘোষনা সাইরেন-হেন শোনা গিয়েছিল আরেকবার। এক মধ্যরাত্রে। ঘোষক-কন্ঠ মদে চোবানো হলেও, এ’যে মাতাল বাবলু বিশ্বাস, তা নিশ্চিত বলে দিতে হয়নি কাউকে। প্রাক্তন ওয়ার্ড কমিশনারটি বাড়ি ফিরতো মধ্যরাত্রি কে ছিঁড়ে, প্রতি রাতেই। তবে এমতো উৎফুল্ল ঘোষণা সচরাচর শোনেনি পাড়ার লোক। রাত্রিটি শীতের। ঘন, জমাট কুয়াশার। বাঁশ-পাতা থেকে টুপটাপ শিশির-ঝরার। শহরেরো সারা গা’য়ে কুয়াশা-মশারি। সেই মশারি ছিঁড়ে গেলো বাবলু বিশ্বাসের মাতাল কন্ঠে “ভেঙ্গে গেছে। দেওয়াল ভেঙ্গে গেছে। শালা’রা শেষ। শালারা পুরাপুরি শেষ, ইন্টারনেশনেলি ডুম্‌ড ”...। ইত্যাদি। এই ঘোষণার কেন্দ্রে, যা বোঝা গেলো একটি দেওয়াল ও তার ভেঙ্গে যাওয়া এবং সেই ভেঙ্গে যাওয়ার মূল্যে কোনো “শালা” রা “ইন্টারনেশনেলি শেষ”। 

এই দেওয়ালটি ও তার ভেঙ্গেপড়ার প্রচার, এইভাবেই, সত্য-মিথ্যা, বোঝা-না বোঝা মিলিয়েআরো বহু বহু মাতাল, বিশ্বময় ছড়িয়ে দিয়েছিল তখন। একদল ওই মাতাল বাবলু বা পুঁটি-বাবু’র মতোই নেচে উঠেছিল “শালারা ইন্টারনেশনেলি শেষ” বলে। আরেকদল, বা আরো অনেক দলই নিজ নিজ বৃত্ত-দাদা’দের অথবা পার্টির সেন্ট্রাল কমিটির মুখ চেয়েছিল ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের আশায়। 

তখনকার মফস্বলে ডিটিপি ছিলনা। ফলে, সেই “বড়ো এবং “প্রতিষ্ঠিত” পত্রিকা-মালিকদের ভাষার যা অদ্যকার “মাশরুম লোকাল”, সেই পত্রিকাগুলি ছিলনা। ছিল বাসি কলকাত্তাই পত্রিকা । সেই সকল “বড়” পত্রিকা দিগের দ্বারা ঘোষিত ও প্রতিষ্ঠিত “ইন্টেলেকচুয়াল” দের মতামত, ওই সব কাগজের ভাষায় আউড়ে যাওয়াই, মুষ্টিমেয় কয়েকজন বাদে, ছিল “বুদ্ধিজীবিত্ব”।  সটীক কলকাত্তাই মুদ্রিত ভার্সনের আগেই অবশ্য ইথার বাহিত হয়ে সংবাদটি পৌঁছে গিয়েছিল প্রকৃত পিপাসুদের কাছে। সেই পিপাসু তথা নিজ মগজকে নিজস্ব ভাবে প্রয়োগ ক্ষমতার অধিকারীদের সংখ্যা ছিল অতি নিগণ্য। ফলে , দিন দুই বাদে, কলকাত্তাই “নিউজ পেপার” গুলিই মফস্বলের হাটে হাঁড়ি ভাঙলো। ‘খাস’ খবর কে “আম” করে দিল। সেই  মধ্যরাত্রেই বাবলু মাতালও দিয়েছিল ওই রায় “শালারা শেষ। ইন্টারনেশনেলি শেষ”। 

সুকুমারের মনে পড়লো মুখ, বাদক ভটের সেই মৃত, পুঁটি-বাবু-ঘোষিত, “ইন্টারন্যাশন্যাল” কন্যাটির।