Friday, November 29, 2024

১। খামবন্দী চিঠি

১। খামবন্দী চিঠি

পাহাড়িয়া শহর খারলং’এর খারনাই লেকের জলে, খারলং পাব্লিক হেলথের বড় সাহেব সতীশ দেবের লাশ ভেসে উঠবার সংবাদটি যখন, প্রায় দেড় হাজার মাইল দূরে,সুকুমারের জন্য, খামে বন্দী অবস্থায়, আক্ষরিকই অপেক্ষমান – তখন সন্ধ্যা নামছে টাটাবাবার রাজত্বে। টাটাবাবার গোটা শহরটিই যে কারখানাটিকে ঘিরে, তার “বি” গেটের দিকে, তখন আস্তে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে সুকুমার। আস্তে ধীরে, কেননা সে চায় তার সঙ্গের লোকগুলি থেকে আলগা থাকতে। শুধু এখনই নয়, সব সময়। “বি” গেটের বদলে “এ” আর “সি” গেট দিয়েও যাওয়া আসা করা যায়। দুই দিন তা করেও দেখেছে সুকুমার। কিন্তু দুটি গেটই তার বসত থেকে দূরে। সব মিলিয়ে মাইল দুই ঘুরে যেতে হয়। নিতে হয় অটো রিক্সা। কোম্পানী বাড়ি ভাড়া নিয়েছে এই “বি” গেটের কাছেই – যাতে হেঁটে আসা-যাওয়া, সম্ভব হয়, কেরানী, ওভারসীয়ার  এবং সুকুমার-হেন “ইঞ্জিনীয়ার” দেরও।  মজুরদের জন্য বাসা নেওয়া হয় ওই গেটেরই নিকটতম বস্তিতে।

সন্ধ্যা যে নামছে, নামে – তা এখানে জানা যায় টাটাবাবা-চত্বর জোড়া সংখ্যার অতীত “ভোঁ”র ঘোষনায়। এই “ভোঁ” যতোটা ছুটির ঘোষণা, তার চেয়ে বেশী পরের শিফ্‌টের, রাতের শিফ্‌টের আরম্ভের হুংকার অথবা হুমকি। ভোঁ-বাজা আর ক্রমে ক্রমে বাতিগুলির জ্বলেওঠা। নিওন, আর্গন, ক্রিপ্টন, জেনন্‌ – সম্ভবত যতো রকমের গ্যাসে বাতি জ্বলা সম্ভব, সবই জ্বলে এখানে। জ্বালানো হয় এখানে। সারারাত ধরে। জ্বলে, কিন্তু আলো কি দেয়? যদি আলো দিতো, এই সহস্র বাতি, তাহলে টাটাবাবার প্রতিটি গেটের অদূরেই, কি করে এরা দাঁড়িয়ে থাকতো, থাকতে পারতো, অন্ধকারে? মোটর বাইক, স্কুটার থেকে শস্তা মোটর হয়ে হাল ফ্যাশনের মোটর অব্দি দাঁড়িয়ে যেতে থাকে লাইন দিয়ে। বিকাল না গড়াতেই। সূর্য নিবে যাওয়ার পরে এরাও দেয় নিজ নিজ বাহনের হেডলাইট বন্ধ করে। কিন্তু তাতে কিছু আসে যায় না। তাদেরও না। যারা তাদের কিনার দিয়ে পার হয়ে যায়, এদেরও না। আর যারা গিয়ে উঠেপড়ে ওই সকল বাহনে? – তাদের কিছু আসে-যায় কি’না, এ নিয়ে তারা নিজেরাও আর মাথা ঘামায় কি’না কেজানে। 

যদিও টাটাবাবা’র কারখানা চত্বরে জ্বলে ফারেনহাইট তিন হাজারের অগুনতি চুল্লী তথাপি সেখানে সাড়ে ন’শ ফারেনহাইটের সিগারেট, বিড়ি, “ধূম্রপান” – “দণ্ডনীয়”। ফলে গেট “বি” পার হয়ে এসেই, বার হয়ে এসেই, অনেকেই, তৎক্ষণাৎ জ্বেলে নেয় সিগারেট, বিড়ি – যার যা “আওকাত”। “আওকাত” মতো দামের সিগারেট জ্বেলে নেয় সুকুমারও। ফার্নেস থেকে গলগল করে বার হয়ে আসা ধোঁয়ার মতো গলগল করে বার হয়ে আসছে মানুষ। “বি” ফটকের “এক্সিট” গলী দিয়ে। “এন্ট্রি” গলী দিয়ে গলগল ঢুকে যাচ্ছে রাত-কাবারের লোকেরা। 

পাকা সড়কের থেকে সামান্য উঁচুতে, নিচু দেওয়াল ঘেরা তল্লাটের মাঝারি লোহা-গেটের কিনারে নাম খোদাই “মীনারানী সিং”। লোহা-গেট, রাত ঠিক এগারোটায়, তালাবন্ধ করবার দায়িত্ব যে রাজকুমার সিং'এর, সে', সম্পর্কে, মীনারানী সিং এর “আদমী”। তার আওরতের মতোই, সে'ও যে যৌবনে ছিল সুদর্শন, তা এখনো, দিনে প্রায় গ্যালন খানেক দিশী মদ এবং এই দুনিয়ায় পঁয়ষট্টি টি বচ্ছর কাটিয়ে দেওয়া সত্ব্বেও, যায় টের পাওয়া। মীনারানীও ষাট পার করে দিয়েছে। তথাপি সাজগোজ করে সে যখন ডিউটি করতে যায়, ‘কাম’ শব্দটি তাকে ঘিরে ডেউ তোলে রীতিমতো। ফটকের ডানদিকে দোতলা। সিং দের বসত। পিছে ফেলে সামান্য এগিয়ে তেতলা। সিং'দের তালুক বললে তালুক, মুলুক বললে মুলুক। এই মহলই ভাড়া নিয়েছে কোম্পানি। ক্যামকন ইঞ্জিনিয়ারিং। নিয়েছে অথবা গত সাত বচ্ছর ধরেই নিচ্ছে, একসঙ্গে তিন বচ্ছরের লিজ’এ। লিজ এই নিয়ে তিন নম্বর এক্সটেনশন হলো লিজের।

এই সকল সংবাদের সূত্র সাহাবাবু। সত্যকাম সাহা। সাহাবাবু অমিতাভ রায়ের ভগ্নিপতি ।  ঠিক যেমন ভোম্বল অমিতাভ রায়ের শালা। অমিতাভ রায় যেহেতু দুই মালিকের একজন, ফলত এই কোম্পানিকে অনেকেই শালা-জামাইবাবু কোম্পানি বলে। বলে, এমন কি অমিতাভ রায়ের পার্টনার পরমেশ সেনও। 

পাকা সড়কের থেকে উঠে যাওয়া তিন থাক সিঁড়ি ভেঙ্গে উঠে লোহা গেট খুলে মহল্লায় ঢুকলো সুকুমার। অর্থাৎ তার জন্য অপেক্ষা করে থাকা খবর, পাহাড়িয়া শহর জাফলং’এর খারনাই লেকের জলে, জাফলং পাব্লিক হেলথের বড় সাহেব সতীশ দেবের লাশ ভেসে উঠবার, যা এখনো খামবন্দী, চিলে কোঠায়, যে চিলে কোঠা হয় তার বসত-কোঠা, একা বাস করতে পারার নিমিত্ত যা সুকুমার নিজেই নিয়েছে বেছে, সেই কোঠার মেঝেতে, তার অনেকটাই কাছাকাছি চলে এলো সুকুমার। চিঠিবাক্স খুলে, দুপুরে, চিঠি নিয়ে, খামের উপরের নাম পড়ে নিয়ে, চিঠি গুলিকে তেতলার প্রতি তলায়, “ক্যামকন” লেখা কার্ডবোর্ড বাক্সে রেখে দিয়ে তবে ডিউটি করতে যায় মীনারানী সিং। চিলেকোঠায় আগে কেউ ছিলনা। ফলে “ক্যামকন” লেখা বাক্সও হয়নি। ফলে সুকুমারের চিঠিপত্র তার দরজার তলা দিয়ে গলিয়ে দেয় মীনারানী সিং।

এতোক্ষণে অন্যেরা যে যার মতো করে গুছিয়ে নিয়েছে মোটামুটি।  অর্থাৎ সিঁড়ি ভেঙ্গে ছাতে, চিলেকোঠায়, উঠবার পথে কারো সঙ্গে মুখামুখি সাক্ষাৎ সম্ভাবনা নেই। সময়ের এই ব্যবধান টুকু নির্মাণ করে নিতে শুধুমাত্র ঢিলিয়ে হাঁটাই যথেষ্ট নয়। টাটাবাবার গেট থেকে ঢিমেতালে হাঁটতে হাঁটতে আসে নালা-পুল। পার হয়ে যে ধাবাটি, যার রুটি,শব্জি থেকে চা —- তল্লাটের বিস্বাদ-তম তথাপি শস্তাতম নয়, সেখানেই ঢুকতে হয় সুকুমার কে। এক প্লেট রুটি-ঘুঘনি এবং চা নিয়ে, অর্ধেক খেয়ে বাকিটা রেখেই ওঠে। প্রতিদিন।  এই সময়ের মধ্যে যারা সিং-মহলে ফেরা', ফিরে যায়। সিং-মহলের কাছাকাছি নাস্তা কাম দারু দোকানে যাওয়ার যারা, চলে যায়।  ফলে সিং-মহলে ঢুকে, তথাকথিত “সহকর্মী” দের মুখদর্শন না করেই সুকুমার ফিরতে পারে তার কুঠুরিতে। অন্ততঃ আশি ভাগ দিন। কুড়ি ভাগ দিন পড়ে যেতে হয়, হয়েছে, কারো না কারো মুখামুখি।  প্রথম প্রথম অসুবিধা হতো, অস্বস্তি হতো। এবং তা ছিল দ্বিপাক্ষিক। অন্য পক্ষ তখনো বোঝেনি, এখনো বোঝেনা, এই নিতান্ত ছোকরা, কালকের পাশ দেওয়া “ইঞ্জিনিয়ার” কেন এড়িয়ে যেতে চায় তাদেরকে।  আদিতে এটা সুকুমারের বি-ই ডিগ্রির গরিমা বলে ভেবে নেওয়ার কিঞ্চিৎ ঝামেলা হয়েছিল। তবে, গত চার মাসেসুকুমারের একলা-একা থাকতে চাওয়ার হেতু কিংবা রহস্য সঠিক টের না পেলেও, এটুকু এরা বুঝে নিয়েছে, যে, এটা অহং জনিত নয়। ফলে, ক্রমে, এরাও, কৌতূহল থাকলেও, সুকুমার কে নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি প্রায় করেনা আর।

তেতলা পার হয়ে ছাতে উঠে আসে সুকুমার। চিলেকোঠার দৌলতে এই বিরাট ছাতের মালিকানা, বিশেষত রাতের, ফাউ পেয়েছে সে। ঠিক যেমন ছাতের কোনে জল-কলটির অধিকার। হাঁটু মুড়ে বসে, নিচু কল’ টি খুলে কয়েক আঁজলা জল খায় সুকুমার। উঠে দাঁড়ায়।  ধরিয়ে নেয় একটা সিগারেট। চাবি দিয়ে তালা খুলে নিজ বসত-কোঠায় ঢুকবার কোনো প্রয়াস, আজো সে নেয়না। অন্য দিনের মতোই টাটাবাবার গ্যাসবাতি ঝলসানো আকাশ-টুকরোর বিপরীতে, যে টুকরো অন্ধকার, সে দিকে নিবিষ্ট হয় সে। নিবিষ্ট হয়, কারন সে জানেনা, তার জন্য অপেক্ষা করে থাকা খবর, পাহাড়িয়া শহর খারলং’এর খারনাই লেকের জলে, খারলং পাব্লিক হেলথের বড় সাহেব সতীশ দেবের লাশ ভেসে উঠবার, এখনো খামবন্দী, তার বসত-কোঠার মেঝেতে।