Friday, November 29, 2024

২। অথ পুঁটি-বাবু উবাচ

২। অথ পুঁটি-বাবু উবাচ

সন্ধ্যা আর রাতের মাঝামাঝি এই সময়টায় হাওয়া আসে। আসে কোনো সমুদ্র, নদী থেকে, নিশ্চয়। কিন্তু টাটাবাবার মানচিত্রে ঢুকে পড়া মাত্র, আর সমস্ত চরিত্র হারিয়ে, হাওয়াও যায় ঝলসে৷ পুড়ে। যেন টাটাবাবাবার কারখানা অন্দরের ফার্নেস গুলির, সেই বিরাট সব চুল্লী গুলির দাউ দাউ, পোড়া গন্ধ,  পোড়ানো গন্ধ বিলিয়ে বেড়ানোর হরকরা’ই হয়ে ওঠে সে। সে, মানে, বাতাস। 

                       সে, মানে, বাতাস, আসে সিং মহলেও। এসে, আর দিনের মতোই, সিং মহলের ছাত ধরে উড়ে গিয়ে,ছাত-প্রান্তের ছোট কোঠাটিতে ঢুকে পরে চৌকাঠের ফাঁক গ'লে। আর-দিনের মতোই। আর-দিনের মতোই যখন, সে, বাতাস, হাওয়া, উল্টেপাল্টে দিচ্ছে, চৌকাঠের ওইপাড়ে,মেঝেতে  ছড়িয়ে থাকা দুটি তিনটি চিঠিকে, পত্রিকাকে, তখন, সুকুমার, টাটাবাবার গ্যাসবাতি ঝলসানো আকাশ-টুকরোর বিপরীতে, যে টুকরো অন্ধকার, সে দিকে নিবিষ্ট হয়ে, সেই অন্ধকার ফুঁড়ে, অন্য দিনের মতোই চলে গেছে অনেক দূর।

মনে মনে তার এই যাওয়া আসা, আসা যাওয়া চলে, চলতেই থাকে, সর্বক্ষণ। কিন্তু দিনের, কাজের, কোলাহল তখন মন-পুকুরের গা'য়ে ফেলেরাখে যে শ্যাওলা-আস্তর, তাতে, মনের ওই যাওয়া আসা, আসা যাওয়া, সম্পূর্ণ টের পায়না মনও। তবে দোলা খায় শ্যাওলাদাম। ‘আনমনা’ শব্দটি যায় মন-দরজায় টোকা দিয়ে। সারাদিনের সেই সমস্ত দোলা, টোকা, ধাক্কা —- ঢেউ হয়ে উঠে আসে সন্ধ্যায়। শ্যাওলা-প্রচ্ছদ ছিঁড়ে আমূল সুকুমারের দখল নেয়। প্রায় প্রতিদিনই, উড়তে উড়তে, সে হানা দিতে চায় প্রথম পৃষ্ঠায়, অথবা প্রথম পৃষ্ঠা থেকে পড়তে পড়তে, আসতে চায়, আজকের, তন্মুহুর্তের, পাতাতে। যেমন এই মুহুর্তে চোখে ভাসছে একটি মেঘলা বিকাল। মফস্বলের। সেই বিকাল, মেঘলা ছিঁড়ে উঠে আসছে একটি স্বরঃ “বাদল ভটের মাইয়া অখন ইন্টারনেশনেল”।

“বাদল ভটের মেয়ে এখন ইন্টারনেশনেল” – ঘোষনা করেছিল বাবু। পুঁটি-বাবু। পুঁটি, কেননা পুঁটিমাছের মতো ছোটখাটো আর কাঁটাও তেমনি। নামটি হয়, বাবু। দুয়ে মিলে পুঁটি-বাবু। ঘোষনা করেছিল এক মেঘলা বিকালে, প্রত্যন্ত মফস্বলি বিকালে, রকেট-বেগে সাইকেল চালিয়ে, সারা পাড়া ঘুরে ঘুরে - “বাদল ভটের মেয়ে এখন ইন্টারনেশনেল”।  এখানে “ইন্টারনেশনেল” অর্থে, মেয়েটিকে দেখতে পাওয়া, আমাদের সীমান্ত শহরে, “আর কে জৈন” টর্নামেন্টে ফুটবল খেলতে আসা, বাংলাদেশের এক খেলোয়াড়ের সঙ্গে। “আর কে জৈন” শব্দটি বেজে উঠলো। বেজে উঠলো কিশোরকুমারের কন্ঠেঃ ‘ ও রামা রামা রামা রামা / রামা রামা রে / মেনে মানা মেনে মানা মে হুঁ মাওয়ালী /মাওয়ালী হুঁ মে / শয়তান তো নেহি /গিরা হুয়া কোই ই তো নেহি /ও রামা রামা রামা রামা  রামা রামা রে...’। সুকুমারকে ঘিরে নেমে এলো শীত। শীত ঋতু। 

শীতের মাঝামাঝি। বাতাসে হিম। ঘাসের শরীরে শিশির। জাটিঙ্গা-কমলার ঘ্রানে বাজার ম’ম। ফুরিয়ে আসছে ইংরেজি বছর। প্রতি বছরেই এই সময়ে চোঙ্গা-মাইক ঝুলিয়ে শহরময় ঘুরে বেড়ায় সাইকেল রিক্সা। নানা চোঙ্গা’য় নানা বার্তা। “করিম-মঞ্জ শঅরে সার্কাস, জেমিনি সার্কাস, আসুন দেকুন, সপরিবারে”। “ত্রিপুরা রাইজ্যের বিক্যাত যাত্রাপার্টি, মাকাল অপেরা, মহাকাল অপেরা… রুজ সিন্ধ্যা থেকে দুইটি পালা”। … “করিমগঞ্জো শহরবাসীকে আরকে জৈন ফাউন্ডেশনের অবিনন্দন। আবারো এসে পরলো বিক্যাত আরকে জৈন ফুটবল টুর্নামেন্ট। ইন্টারনেশনেল টুর্নামেন্ট। মনে রাকবেন অন্তর-জাতির টুর্নামেন্টে যুগ দিচ্ছেন বাংলাদেশের রাজিশাহী থেকে …”। ইত্যাদি ইত্যাদি। 

তখন ক্লাস সিক্স। হঠাৎই আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে বাজনা  ‘ ও রামা রামা রামা রামা   রামা রামা রে’। চলছে বাৎসরিক পরীক্ষা আর সুকুমারদের ইস্কুলেরই মাঠ ঘিরে দেওয়া হয়েছে ঢেউ-টিনের ঘেরাটোপে। দিকে দিকে মাইক। বাক্স লাউড্‌ স্পীকারের জমানা মফস্বলে আসেনি তখনো। খেলা আরম্ভ হলে ঐ সব মাইকে চলে ধারা বিবরণী আর বাকি সময় বাজতে থাকে গান। কখনো “রামা রামা রামা রামা রামা রামা রে”, কখনো “ঝ ঝ ঝোপ্‌ড়ি মে চা চা চারপাই/ জীবন মেরা উসি পর্‌ হি...” ...ইস্কুলের ক্লাসঘরে বসে পরীক্ষার খাতায় ভূগোল,ইতিহাস কিংবা বিজ্ঞানের প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতে মন হারিয়ে যায় ঐ সব অদ্ভুত কথার,উদ্ভট সুরের টানে। ডিসেম্বর মাসে বাৎসরিক পরীক্ষা হওয়ার রীতি’র সেই শেষ বছর। পরের বছর থেকেই বাৎসরিক পরীক্ষার মাস হয়ে গিয়েছিল গ্রীষ্মে। এপ্রিল মাসে।



          খেলা আরম্ভ হয় বিকাল চারটেতে। টিকিট কাইন্টারের সামনে ভিড় বাড়তে থাকে তিনটে থেকেই।  রিক্সাওয়ালা থেকে কলেজ শিক্ষক, জজ্‌-মেজিস্ট্রেট্‌  সকলেই উপস্থিত ঐ ভিড়ে। সেমি ফাইন্যাল আর ফাইন্যালের দিনে ছুটি দেওয়া হয় ইস্কুল কলেজ। ছেলে বুড়ো বাচ্চা এমনকি বাড়ির মহিলারাও এসে হাজির হন সেই খেলা দেখতে। শীতের মাঝামাঝি। বাতাসে হিম। ঘাসের শরীরে শিশির। জাটিঙ্গার কমলার ঘ্রান বাতাসে ম’ম। ফুরিয়ে আসছে ইংরেজি বছর। “নেতাজী মেলা” এসে পড়লো বলে। ঠিক এই সময়েই ইংরেজি নতুন বৎসরে আর “নেতাজী মেলা” দুয়েরই আগমনী হয়ে আরম্ভ হয় এই ফুটবল টর্নামেন্ট্‌। আর কে জৈন স্মৃতি ফুটবল  টর্নামেন্ট্‌। মফস্বলের বুকে যেন এসে হানা দেয় এক ঝলক  টাট্‌কা দমকা বাতাস। খেলতে আসে  ‘এ ডিভিশন’ দলগুলি— মিজোরাম,ত্রিপুরা,নাগাল্যান্ড,মনিপুর থেকে। আসে আসাম পুলিশের দল। আন্তর্জাতিক দল আসে কুশিয়ারা নদী পারহয়ে। বাংলাদেশ থেকে। খেলোয়াড়দের সবার স্থান সংকুলান হয়না মফস্বলি হোটেলে,মোটেলে। ডাক বাংলোতেও ওঠেনা কুলিয়ে। ফলে তাঁবু পড়ে খেলার মাঠের পাশে। খেলোয়াড়দের তাঁবু। আমাদের ইস্কুলবাড়ির কোঠাতেও আশ্রয় নেন খেলোয়াড়ের দল। আমরা গিয়ে ভিড় জমাই সেই কোঠাগুলোর আশে পাশে। হাঁ করে দেখি তাদের জুতো,জার্সি,তাদের পৌরুষ। তাদের বীরত্বগাথা ছাপাহয় আঞ্চলিক কাগজে। গতি,সোনার কাছাড়ের কাটতি বেড়েযায় হুহু করে। 

সুকুমারের মর্মে ফিরে আসে সেই দিন-গোনা’র দিন – কবে শেষহবে এই কালান্তক বাৎসরিক পরীক্ষা আর মিশে যাওয়া যাবে ওই সকল উৎসবে। শীতের উৎসবে। সেই সঙ্গে, এখন, এ’ও মনে হয় সুকুমারের, যে, আবাল বৃদ্ধ বণিতার এই হাজির হওয়ার গহনে যতো-না ছিল ফুটবল প্রীতি তার চেয়ে ঢের বেশী উদ্দীপনা এক রকমের উৎসবের। আমোদ, সার্কাস দেখার। 

পরীক্ষার সময় একেক বেঞ্চিতে বসানো হয় মাত্র দুজন করে। বেঞ্চির দুই মাথায় দুইজন। তা’ও আবার দুইজন দুই ক্লাসের। সুকুমার ক্লাস সিক্স। তার প্রতিবেশী “সেভেন”। ফলে লাভ হয়না উঁকি ঝুঁকি দিয়েও। পরীক্ষা চলে দুই বেলাই। দশটা থেকে একটা। দুইটা থেকে পাঁচটা। 

অন্য ইস্কুলের নিয়ম আলাদা। তাদের ‘সকাল’ মানে ন’টা থেকে বারোটা। ‘বিকাল’ মানে একটা থেকে চারটা। সেবার সুকুমারের সব পরীক্ষাই পরেছিল  বিকালে।  সীট পড়েছে ইস্কুলের যে কোঠাগুলি বড় রাস্তার দিকে, তারই একটাতে। ফলে চারটা বাজতে না বাজতেই জানালা দিয়ে দেখা যায়  ‘মদন মোহন মাধব চরণ উচ্চতর মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ে’র বালিকারা নেমে পড়েছে রাস্তায়। ফ্রক পড়ে, শাড়ি জড়িয়ে – যেন চলেছে দলে দলে উড়ন্ত প্রজাপতি। সুকুমারের বসা কোঠার যে পাশে, বড় রাস্তা তার উল্টোদিকে। তাই ঐ দিকে দেখতে গেলে দেখতে হয় ঘাড় ঘুড়িয়ে। সুকুমার ঘাড় ঘোরায়। একবার – দুইবার – তিনবার – মাষ্টার মশাই না দেখলেও দেখে ফেলে প্রতিবেশী, ক্লাস সেভেনের ‘দাদা’। সে ভালো ছেলে। বাঁদিকে সিঁথি কেটে, পরিষ্কার জামা কাপড় পরে আসে পরীক্ষা দিতে। ধীরে সুস্থে লেখে। তারপর ‘রিভিশন’ দেয় খাতা জমা দেওয়ার আগে । পরে আলাপ পরিচয় হয়েছিল তার সঙ্গেও সুকুমারের।  তার নাম ‘সৌমিত্র’,তার বাড়ি ‘পাগলা পট্টী’ আর ‘হাসপাতাল রোড’ এর ‘জাংশনে’। সুকুমারের এই উঁকি ঝুঁকি, বালিকা দেখবার আগ্রহ, পছন্দ হলোনা সৌমিত্রর। ঘাড় ঘুরিয়ে বল্লোঃ ‘জানালার দিকে তাকিয়ে থাকলে লিখবি কখন?’ – সত্যিইতো! সুকুমারও ভাব্লো “লিখবো কখন? আর যে বাকী মাত্র আধঘন্টা সময়! এখনো উত্তর লেখা হয়নি তিনটে বড় প্রশ্নের! আর কে জৈনের মাইকে গান থেমে শুরু হয়েগেছে “রীলে”!” সুকুমার  চেষ্টা নেয়, প্রতিদিনই,  প্রশ্নোত্তরে মন দেওয়ার। কিন্তু মন টেনেনেয় ‘মদন মোহন মাধব চরণ উচ্চতর মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ে’র উড়ন্ত প্রজাপতিরা। মন টেনেনেয় আর কে জৈনের রীলে। উত্তর, তিনটি প্রশ্নের, পুরোপুরি লিখে শেষ করবার আগেই বেজেযায় শেষ ঘন্টা। বাড়ি এসে বাবাকে মিথ্যে বলতে হয়। মিথ্যে বলতে হয় মাষ্টার মশাইকে। “ সব উত্তর দিয়েছি”।  “রিভিশন” দিয়েছি শেষ আধা ঘন্টা। এই সকল মিথ্যা বলবার আবডালে, প্রতিদিনই, মনে মনে ঠিক করে সুকুমার, “ আর নয় –  পরের পেপারটা দিতেই হবে ভালো করে।”  কিন্তু যেইমাত্র কানে আসে আকে জৈনের গান ‘মামামিয়া / পম্‌ পম্‌’, ‘নয়না মে সপ্‌না নয়না মে সজনা / সজনী কা দিল্‌ আ গয়া’ কিংবা ‘বক্‌ বক্‌ বক্‌ মত্‌ করো নাক তেরা লম্বা / লাকড়ি কা খম্বা...’ – তৎক্ষণাৎ মহম্মদ ঘোরী কিংবা আলাউদ্দিন খিলজীর জীবনীর বদলে চোখে ভেসে ওঠে ‘মদন মোহন মাধব চরণ উচ্চতর মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ে’র উড়ন্ত প্রজাপতিরা। চোখ অপেক্ষা করে থাকে কখন পরীক্ষা শেষ করে তারা উড়বে রাস্তায়। 

এরকমই এক আজ-পরীক্ষা-নেই দিন। শীতের আকাশেও এসেছে মেঘ। দুপুর থেকেই। পরদিন পরীক্ষা থাকলেও, কোনো মতে অনুমতি পাওয়া গিয়েছিল আধ ঘন্টা খেলতে যাওয়ার আর তখুনি “বাদল ভটের মেয়ে এখন ইন্টারনেশনেল” – ঘোষনা করেছিল বাবু। পুঁটি-বাবু। পুঁটি, কেননা পুঁটিমাছের মতো ছোটখাটো আর কাঁটাও তেমনি। নামটি হয়, বাবু। দুয়ে মিলে পুঁটি-বাবু। ঘোষনা করেছিল এক মেঘলা বিকালে, প্রত্যন্ত মফস্বলি বিকালে, রকেট-বেগে সাইকেল চালিয়ে, সারা পাড়া ঘুরে ঘুরে - “বাদল ভটের মেয়ে এখন ইন্টারনেশনেল”।  

                                   এমনি আরো একটি ঘোষনা সাইরেন-হেন শোনা গিয়েছিল আরেকবার। এক মধ্যরাত্রে। ঘোষক-কন্ঠ মদে চোবানো হলেও, এ’যে মাতাল বাবলু বিশ্বাস, তা নিশ্চিত বলে দিতে হয়নি কাউকে। প্রাক্তন ওয়ার্ড কমিশনারটি বাড়ি ফিরতো মধ্যরাত্রি কে ছিঁড়ে, প্রতি রাতেই। তবে এমতো উৎফুল্ল ঘোষণা সচরাচর শোনেনি পাড়ার লোক। রাত্রিটি শীতের। ঘন, জমাট কুয়াশার। বাঁশ-পাতা থেকে টুপটাপ শিশির-ঝরার। শহরেরো সারা গা’য়ে কুয়াশা-মশারি। সেই মশারি ছিঁড়ে গেলো বাবলু বিশ্বাসের মাতাল কন্ঠে “ভেঙ্গে গেছে। দেওয়াল ভেঙ্গে গেছে। শালা’রা শেষ। শালারা পুরাপুরি শেষ, ইন্টারনেশনেলি ডুম্‌ড ”...। ইত্যাদি। এই ঘোষণার কেন্দ্রে, যা বোঝা গেলো একটি দেওয়াল ও তার ভেঙ্গে যাওয়া এবং সেই ভেঙ্গে যাওয়ার মূল্যে কোনো “শালা” রা “ইন্টারনেশনেলি শেষ”। 

তখনো হতো কি ওই টর্নামেন্ট? আরকে জৈন?




১। খামবন্দী চিঠি

১। খামবন্দী চিঠি

পাহাড়িয়া শহর খারলং’এর খারনাই লেকের জলে, খারলং পাব্লিক হেলথের বড় সাহেব সতীশ দেবের লাশ ভেসে উঠবার সংবাদটি যখন, প্রায় দেড় হাজার মাইল দূরে,সুকুমারের জন্য, খামে বন্দী অবস্থায়, আক্ষরিকই অপেক্ষমান – তখন সন্ধ্যা নামছে টাটাবাবার রাজত্বে। টাটাবাবার গোটা শহরটিই যে কারখানাটিকে ঘিরে, তার “বি” গেটের দিকে, তখন আস্তে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে সুকুমার। আস্তে ধীরে, কেননা সে চায় তার সঙ্গের লোকগুলি থেকে আলগা থাকতে। শুধু এখনই নয়, সব সময়। “বি” গেটের বদলে “এ” আর “সি” গেট দিয়েও যাওয়া আসা করা যায়। দুই দিন তা করেও দেখেছে সুকুমার। কিন্তু দুটি গেটই তার বসত থেকে দূরে। সব মিলিয়ে মাইল দুই ঘুরে যেতে হয়। নিতে হয় অটো রিক্সা। কোম্পানী বাড়ি ভাড়া নিয়েছে এই “বি” গেটের কাছেই – যাতে হেঁটে আসা-যাওয়া, সম্ভব হয়, কেরানী, ওভারসীয়ার  এবং সুকুমার-হেন “ইঞ্জিনীয়ার” দেরও।  মজুরদের জন্য বাসা নেওয়া হয় ওই গেটেরই নিকটতম বস্তিতে।

সন্ধ্যা যে নামছে, নামে – তা এখানে জানা যায় টাটাবাবা-চত্বর জোড়া সংখ্যার অতীত “ভোঁ”র ঘোষনায়। এই “ভোঁ” যতোটা ছুটির ঘোষণা, তার চেয়ে বেশী পরের শিফ্‌টের, রাতের শিফ্‌টের আরম্ভের হুংকার অথবা হুমকি। ভোঁ-বাজা আর ক্রমে ক্রমে বাতিগুলির জ্বলেওঠা। নিওন, আর্গন, ক্রিপ্টন, জেনন্‌ – সম্ভবত যতো রকমের গ্যাসে বাতি জ্বলা সম্ভব, সবই জ্বলে এখানে। জ্বালানো হয় এখানে। সারারাত ধরে। জ্বলে, কিন্তু আলো কি দেয়? যদি আলো দিতো, এই সহস্র বাতি, তাহলে টাটাবাবার প্রতিটি গেটের অদূরেই, কি করে এরা দাঁড়িয়ে থাকতো, থাকতে পারতো, অন্ধকারে? মোটর বাইক, স্কুটার থেকে শস্তা মোটর হয়ে হাল ফ্যাশনের মোটর অব্দি দাঁড়িয়ে যেতে থাকে লাইন দিয়ে। বিকাল না গড়াতেই। সূর্য নিবে যাওয়ার পরে এরাও দেয় নিজ নিজ বাহনের হেডলাইট বন্ধ করে। কিন্তু তাতে কিছু আসে যায় না। তাদেরও না। যারা তাদের কিনার দিয়ে পার হয়ে যায়, এদেরও না। আর যারা গিয়ে উঠেপড়ে ওই সকল বাহনে? – তাদের কিছু আসে-যায় কি’না, এ নিয়ে তারা নিজেরাও আর মাথা ঘামায় কি’না কেজানে। 

যদিও টাটাবাবা’র কারখানা চত্বরে জ্বলে ফারেনহাইট তিন হাজারের অগুনতি চুল্লী তথাপি সেখানে সাড়ে ন’শ ফারেনহাইটের সিগারেট, বিড়ি, “ধূম্রপান” – “দণ্ডনীয়”। ফলে গেট “বি” পার হয়ে এসেই, বার হয়ে এসেই, অনেকেই, তৎক্ষণাৎ জ্বেলে নেয় সিগারেট, বিড়ি – যার যা “আওকাত”। “আওকাত” মতো দামের সিগারেট জ্বেলে নেয় সুকুমারও। ফার্নেস থেকে গলগল করে বার হয়ে আসা ধোঁয়ার মতো গলগল করে বার হয়ে আসছে মানুষ। “বি” ফটকের “এক্সিট” গলী দিয়ে। “এন্ট্রি” গলী দিয়ে গলগল ঢুকে যাচ্ছে রাত-কাবারের লোকেরা। 

পাকা সড়কের থেকে সামান্য উঁচুতে, নিচু দেওয়াল ঘেরা তল্লাটের মাঝারি লোহা-গেটের কিনারে নাম খোদাই “মীনারানী সিং”। লোহা-গেট, রাত ঠিক এগারোটায়, তালাবন্ধ করবার দায়িত্ব যে রাজকুমার সিং'এর, সে'ই, সম্পর্কে, মীনারানী সিং এর “আদমী”। তার আওরতের মতোই, সে'ও যে যৌবনে ছিল সুদর্শন, তা এখনো, দিনে প্রায় গ্যালন খানেক দিশী মদ এবং এই দুনিয়ায় পঁয়ষট্টি টি বচ্ছর কাটিয়ে দেওয়া সত্ব্বেও, যায় টের পাওয়া। মীনারানীও ষাট পার করে দিয়েছে। তথাপি সাজগোজ করে সে যখন ডিউটি করতে যায়, ‘কাম’ শব্দটি তাকে ঘিরে ডেউ তোলে রীতিমতো। ফটকের ডানদিকে দোতলা। সিং দের বসত। পিছে ফেলে সামান্য এগিয়ে তেতলা। সিং'দের তালুক বললে তালুক, মুলুক বললে মুলুক। এই মহলই ভাড়া নিয়েছে কোম্পানি। ক্যামকন ইঞ্জিনিয়ারিং। নিয়েছে অথবা গত সাত বচ্ছর ধরেই নিচ্ছে, একসঙ্গে তিন বচ্ছরের লিজ’এ। লিজ এই নিয়ে তিন নম্বর এক্সটেনশন হলো লিজের।

এই সকল সংবাদের সূত্র সাহাবাবু। সত্যকাম সাহা। সাহাবাবু অমিতাভ রায়ের ভগ্নিপতি ।  ঠিক যেমন ভোম্বল অমিতাভ রায়ের শালা। অমিতাভ রায় যেহেতু দুই মালিকের একজন, ফলত এই কোম্পানিকে অনেকেই শালা-জামাইবাবু কোম্পানি বলে। বলে, এমন কি অমিতাভ রায়ের পার্টনার পরমেশ সেনও। 

পাকা সড়কের থেকে উঠে যাওয়া তিন থাক সিঁড়ি ভেঙ্গে উঠে লোহা গেট খুলে মহল্লায় ঢুকলো সুকুমার। অর্থাৎ তার জন্য অপেক্ষা করে থাকা খবর, পাহাড়িয়া শহর জাফলং’এর খারনাই লেকের জলে, জাফলং পাব্লিক হেলথের বড় সাহেব সতীশ দেবের লাশ ভেসে উঠবার, যা এখনো খামবন্দী, চিলে কোঠায়, যে চিলে কোঠা হয় তার বসত-কোঠা, একা বাস করতে পারার নিমিত্ত যা সুকুমার নিজেই নিয়েছে বেছে, সেই কোঠার মেঝেতে, তার অনেকটাই কাছাকাছি চলে এলো সুকুমার। চিঠিবাক্স খুলে, দুপুরে, চিঠি নিয়ে, খামের উপরের নাম পড়ে নিয়ে, চিঠি গুলিকে তেতলার প্রতি তলায়, “ক্যামকন” লেখা কার্ডবোর্ড বাক্সে রেখে দিয়ে তবে ডিউটি করতে যায় মীনারানী সিং। চিলেকোঠায় আগে কেউ ছিলনা। ফলে “ক্যামকন” লেখা বাক্সও হয়নি। ফলে সুকুমারের চিঠিপত্র তার দরজার তলা দিয়ে গলিয়ে দেয় মীনারানী সিং।

এতোক্ষণে অন্যেরা যে যার মতো করে গুছিয়ে নিয়েছে মোটামুটি।  অর্থাৎ সিঁড়ি ভেঙ্গে ছাতে, চিলেকোঠায়, উঠবার পথে কারো সঙ্গে মুখামুখি সাক্ষাৎ সম্ভাবনা নেই। সময়ের এই ব্যবধান টুকু নির্মাণ করে নিতে শুধুমাত্র ঢিলিয়ে হাঁটাই যথেষ্ট নয়। টাটাবাবার গেট থেকে ঢিমেতালে হাঁটতে হাঁটতে আসে নালা-পুল। পার হয়ে যে ধাবাটি, যার রুটি,শব্জি থেকে চা —- তল্লাটের বিস্বাদ-তম তথাপি শস্তাতম নয়, সেখানেই ঢুকতে হয় সুকুমার কে। এক প্লেট রুটি-ঘুঘনি এবং চা নিয়ে, অর্ধেক খেয়ে বাকিটা রেখেই ওঠে। প্রতিদিন।  এই সময়ের মধ্যে যারা সিং-মহলে ফেরা'র, ফিরে যায়। সিং-মহলের কাছাকাছি নাস্তা কাম দারু দোকানে যাওয়ার যারা, চলে যায়।  ফলে সিং-মহলে ঢুকে, তথাকথিত “সহকর্মী” দের মুখদর্শন না করেই সুকুমার ফিরতে পারে তার কুঠুরিতে। অন্ততঃ আশি ভাগ দিন। কুড়ি ভাগ দিন পড়ে যেতে হয়, হয়েছে, কারো না কারো মুখামুখি।  প্রথম প্রথম অসুবিধা হতো, অস্বস্তি হতো। এবং তা ছিল দ্বিপাক্ষিক। অন্য পক্ষ তখনো বোঝেনি, এখনো বোঝেনা, এই নিতান্ত ছোকরা, কালকের পাশ দেওয়া “ইঞ্জিনিয়ার” কেন এড়িয়ে যেতে চায় তাদেরকে।  আদিতে এটা সুকুমারের বি-ই ডিগ্রির গরিমা বলে ভেবে নেওয়ার কিঞ্চিৎ ঝামেলা হয়েছিল। তবে, গত চার মাসে,  সুকুমারের একলা-একা থাকতে চাওয়ার হেতু কিংবা রহস্য সঠিক টের না পেলেও, এটুকু এরা বুঝে নিয়েছে, যে, এটা অহং জনিত নয়। ফলে, ক্রমে, এরাও, কৌতূহল থাকলেও, সুকুমার কে নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি প্রায় করেনা আর।

তেতলা পার হয়ে ছাতে উঠে আসে সুকুমার। চিলেকোঠার দৌলতে এই বিরাট ছাতের মালিকানা, বিশেষত রাতের, ফাউ পেয়েছে সে। ঠিক যেমন ছাতের কোনে জল-কলটির অধিকার। হাঁটু মুড়ে বসে, নিচু কল’ টি খুলে কয়েক আঁজলা জল খায় সুকুমার। উঠে দাঁড়ায়।  ধরিয়ে নেয় একটা সিগারেট। চাবি দিয়ে তালা খুলে নিজ বসত-কোঠায় ঢুকবার কোনো প্রয়াস, আজো সে নেয়না। অন্য দিনের মতোই টাটাবাবার গ্যাসবাতি ঝলসানো আকাশ-টুকরোর বিপরীতে, যে টুকরো অন্ধকার, সে দিকে নিবিষ্ট হয় সে। নিবিষ্ট হয়, কারন সে জানেনা, তার জন্য অপেক্ষা করে থাকা খবর, পাহাড়িয়া শহর খারলং’এর খারনাই লেকের জলে, খারলং পাব্লিক হেলথের বড় সাহেব সতীশ দেবের লাশ ভেসে উঠবার, এখনো খামবন্দী, তার বসত-কোঠার মেঝেতে।